আমেরিকার রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করেই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল ভারতবর্ষ

নিউজ ডেস্কঃ ভারতবর্ষ পরমাণু শক্তিধর দেশ। ব্যাপারটা কি এতো সহজ ছিল? মানে আমেরিকার মতো দেশ গুলির রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে ভারতবর্ষ এরকম একটা কাজ করছে, তা দেশে সত্যি সারা পৃথিবী অবাক হয়েছিল।

সাল ১৯৯৮, ১১ই মেঃ! তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী হঠাৎ সাংবাদিক সম্মেলন ডাকেন। তরিঘরি সমস্ত সাংবাদিক উপস্থিত হয়। আর একটি ঘোষনা করেন তার বলিষ্ঠ কন্ঠে

“ Today, at 15:45 hours, India conducted three underground nuclear tests in the Pokhran range. The tests conducted today were with a fission device, a low yield device and a thermonuclear device. The measured yields are in line with expected values. “

এটা শুধু ঘোষণা ছিল না এটি ছিল সেই শব্দগুলি যেগুলি এক ধাক্কায় মার্কিন দাদাগীরি আর পাক-চাইনিজ হুমকির যোগ্য জবাব ও ছিল বটে। ভারত নিজেকে পৃথিবীর ষষ্ঠ পরমাণু শক্তিধর দেশ হিসাবে তুলে ধরে। আর পৃথিবীতে নিজের সর্বভৌমত্যের অস্তিত্ব চীরতরে পাকা করে।

একাধিক দেশের রক্তচক্ষু সেই এক ঘোষনায় ধ্বংস হয়ে গেছিল। আর সাথে মার্কিন গয়েন্দা সংস্থার বড় বিপর্যয়।

ভারত পরমাণু পরীক্ষা করার সমস্ত প্রযুক্তিতে সিদ্ধহস্ত হয়েছিল ৫০ এর দশকেই। কিন্তু জহরলাল নেহেরু এই প্রযুক্তি বোমা রূপে পরিক্ষার বিরোধী ছিলেন। যদি তিনি বিরোধিতা না করতেন তাহলে ১৯৫৯সালেই ভারতবর্ষ পরমাণুশক্তিধর হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতো বলে মত রাজনৈতিক মহলের। আর হয়তো ১৯৬২ এবং ৬৫সালে চীন আর পাকিস্তান ভারতের সামনে অস্ত্র তোলার ক্ষমতা পেত না। আর বাংলাদেশ হয়তো অনেক আগেই গঠন হয়ে যেত।

তবে ইন্দিরা গান্ধি একদমই এই ব্যাপারটাকে সমর্থন করেনি। তিনি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর “স্মাইলিং বুদ্ধা” নামে ১২কিলোটনের পরমানু অস্ত্রের পরীক্ষা করে ভারত।  তবে সেটা ছিল শান্তিপূর্ণ বিষ্ফরন। এর সাথে ভারত সামরিক সংযোগ সম্পূর্ন অস্বিকার করে।

তবে ভারত তখনই পশ্চিমের দেশ গুলির নজরে পরে। ভারতের পরমানু কর্যক্রমে সন্দেহ প্রকাশ করে অনেক দেশ। তারপর বহু প্রধানমন্ত্রী চেয়েছিল এই প্রোজেক্ট শেষ করতে। কিন্তু বিফল হয়। একাধিক বার ভারতের পরমানু বিষ্ফরনের খবর প্রকাশ্যে আসতে ভারত মার্কিন আর্থিক নিষেধাজ্ঞার হুমকির মুখে পরে। ১৯৯৫সালে ভারত এমন একটি পরীক্ষার প্রচেষ্টা করলে মার্কিন ল্যক্রস গোয়েন্দা স্যটেলাইটের সার্ভেইল্যেন্সের মধ্যে চলে আসে। আর ভারতের বিরুদ্ধে হুমকি দেয় মার্কিন প্রশাসন।

কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন(বর্তমানে রাশিয়া) বাদে সমস্ত সুপার পাওয়ার দেশ গুলির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ভারত আর বাজপায়ীর নির্দেশে আর ডঃ এপিজে আব্দুল কালামের নেতৃত্বে ভারত বিশ্বের সামনে প্রমাণ করে দেয় যে এই দেশকে ভয় দেখিয়ে চুপ করে রাখা সম্ভব নয়।

১১ই মে ভারত তিনটি টেস্ট করেঃ-

শক্তি ১ঃ-  ২০০কিলোটনের ভারতের সবথেকে শক্তিশালী অস্ত্র। যা হিরোসীমার বোমের তুলনায় ১৪গুন বেশি শক্তিশালী ছিল। এটি ছিল একটি থার্মো নিউক্লীয়ার ডিভাইস হাইড্রোজেন বোম্ব। যা ৪৫কিলোটনের শক্তিতে বিষ্ফরন করানো হয়। এর সফলতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলা হলেও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম খুব দৃঢ়তার সঙ্গে এটিকে অস্বিকার করে আর শক্তি-১ কে সম্পূর্ন সফল আক্ষা দেয়।

শক্তি ২- এটি ফিসন ডিভাইস। অর্থাৎ পরমানু বোম্ব। ১৫কিলোটনের বোম্ব। যা ওয়েপেন গ্রেড প্লুটোনিয়াম দিয়ে তৈরি। ১৯৭৪সালের বোমের উন্নত ডিভাইস ছিল। এটি ভারতের পরম সুপার কম্পিউটারের মাধ্যমে সিমুলেশান এর দ্বারা উন্নত করা হয়।

শক্তি ৩- এটি নন-ওয়েপেন গ্রেড প্লুটোনিয়াম দিয়ে তৈরি যা ০.৩কিলোটন শক্তি উৎপন্ন করেছিল। তার সাথে তৈরি হয়েছিল থার্মোনিউক্লীয়ার ডিফাইস তৈরি করার ম্যটেরিয়াল।

শক্তি ৪- এটি ১৩ই মে বিষ্ফরন করা হয়। ০.৫কিলোটনের বিষ্ফরন ছিল।

শক্তি ৫- থোরিয়াম দিয়ে তৈরি ছিল এটি। এটিও ১৩ই মে বিষ্ফরন করা হয়। সব থেকে কম শক্তি নির্গত করে। ০.২কিলোটন।

এর থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট ভারত ছোট পরমানু অস্ত্র নির্মানে পাকিস্তানের অনেক আগে সিদ্ধহস্ত ছিল। আর যত দিন গেছে ভারত আরও নতুন সুপার কম্পিউটারে পরমানু বিষ্ফরনের সিমুলেশান তৈরি করে নিজের পরমানু অস্ত্রকে শক্তিশালী রূপ দিয়েছে।

ভারতের এই পরীক্ষা সর্বপ্রথম উন্নত দেশগুলির সেসমিক ডিভাইসে ভূমিকম্প রূপে প্রকাশ পায়। যা আসলে আমেরিকারনদের বুকে হয়েছিল। তাদের কাছে এই পরীক্ষা সম্পর্কে কোনো তথ্যই ছিল না। ভারত সুদক্ষতার সঙ্গে এটি গোপন রাখে। আর মার্কিন ল্যক্রস স্যটেলাইটকে ফাঁকি দেয়। এর পর ভারতের ওপর পশ্চিমি বিশ্ব সাথে জাপান চীন আর্থিক অবরোধ চাপায়। ক্ষতিগ্রস্থ হয় আমাদের তেজস প্রোজেক্ট। বিরোধী পার্টির প্রচুর জঘন্য মন্তব্যের শিকার হয় বাজপায়ী সরকার। তবুও অটল বিহারী বাজপেয়ী ভারতবর্ষকে সম্পূর্ন সুরক্ষিত করতে তার এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম তাঁর দলের অবদান ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *