রীতিমতো ভয় পেয়ে যায় আমেরিকা সোভিয়েত ইউনিয়নের মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান তৈরি নিয়ে। ভারতবর্ষ প্রথম ক্রেতা হলেও আজও মাশুল দিতে হচ্ছে রাশিয়াকে

রাজেশ রায়: বিভিন্ন দশকে ভারতীয় বায়ুসেনাতে ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটেগরির যুদ্ধবিমান যুক্ত হয়েছে যার মধ্যে অন্যতম হল সোভিয়েত মিগ-২৯, যাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিরোধী জোট ন্যাটো ফুলক্রাম বলে। মিগ-২৯ এর তৈরির পটভূমি রচিত হয় ১৯৬০ এর দশকে। সেইসময় আকাশে রাজত্ব করত সোভিয়েত ইউনিয়নের মিগ-২১ সুপারসনিক ইন্টারসেপ্টর যুদ্ধ বিমান। এর জবাবে আমেরিকার ছিল এফ-৪ ফ্যান্টম বিমান। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বিশেষ করে ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা বুঝতে পারে মিগ-২১ এর সামনে তাদের এফ-৪ ফ্যান্টম টিকতে পারবে না। ১৯৭১ এর ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে, যাকে বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধও বলা হয়, আমেরিকা তাদের ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ সুপার এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার কে ভারত মহাসাগরে পাঠিয়েছিল, সেইসময় আমেরিকার নৌসেনা স্বীকার করেছিল সোভিয়েত সাবমেরিন ছাড়াও তাদের প্রধান চিন্তা ছিল ভারতীয় বায়ুসেনার মিগ-২১ বিমানগুলি। সেইসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকার বায়ুসেনার তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে ছিল। এই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের মিগ-২৩ ও মিগ-২৫  নামে দুটি যুদ্ধবিমান প্রজেক্টে কাজ শুরু করে। 

১৯৬৩ তে মিগ-২৫ এবং ১৯৬৭ এ মিগ-২৩ এর ফাস্ট ফ্লাইট হয়। এই দুটি বিমানই বিভিআর বা বিয়ন্ড ভিসুয়্যাল রেঞ্জ মিসাইল ফায়ারিং ক্ষমতা যুক্ত ছিল। এই ঘটনায় রীতিমতো ভীত হয়ে পড়ে আমেরিকা। আমেরিকা মরিয়া হয়ে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন কে কাউন্টারের জন্য যার জন্য আমেরিকা গোপনে তিনটি বিশেষ যুদ্ধবিমান তৈরির কাজ শুরু করে। আমেরিকার সবচেয়ে বড় তিনটি ডিফেন্স কোম্পানি লকহিড মার্টিন কে এফ-১৬, নর্থ্রুপ গ্রুম্যান কে এফ-১৪ টমক্যাট ও ম্যাকডোনাল ডগলাস কে এফ-১৫ নামে যুদ্ধ বিমান তৈরির কাজ শুরু করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন জানত এফ-১৪ এর ব্যাপারে কিন্তু বাকী দুটো প্রজেক্ট সম্পর্কে তারাও জানত না। যার জন্য আজও রাশিয়া মাশুল দেয়। 

১৯৬৯ সালে আমেরিকার এফ-১৫ এর প্রথম ফ্লাইট টেস্ট হয়, এরপরেই সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের ভুল বুঝতে পারে, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। হতবাক সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি হেভিওয়েট ও একটি মিডিয়াম ওয়েট যুদ্ধবিমান তৈরির কাজ শুরু করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় দুটি অ্যাভিয়েশন কোম্পানি সুখোই করপোরেশন শুরু করে এসইউ -২৭ ও মিকোয়ান কোম্পানি শুরু করে মিগ-২৯ তৈরির কাজ। মিগ-২৯ ও এসইউ-২৭ এর প্রথম ফ্লাইট টেস্ট হয় ১৯৭৭ সালে কিন্ত ততদিনে আমেরিকার বায়ুসেনা তে যুক্ত হয়ে গেছে এফ-১৫, এফ-১৬ ও এফ-১৪. তবে আমেরিকার থেকে ৫-৬ বছর পিছিয়ে থাকলেও মিগ-২৯ সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম সফল যুদ্ধবিমান ছিল।

১৯৭৭ সালের ৬ অক্টোবার প্রথম ফ্লাইট টেস্টের পর ১৯৮২ সালের জুলাই মাসে এটি প্রথম সোভিয়েত বিমানবাহিনীতে যুক্ত হয়। এতটাই অ্যাডভান্সড যুদ্ধবিমান ছিল এটা যে সোভিয়েত তাদের বায়ুসেনায় এই যুদ্ধ বিমান যুক্ত করার আগেই ভারত অর্ডার দিয়ে দিয়েছিল এই বিমানের। আজ পর্যন্ত ১৬০০+ মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান তৈরি করা হয়েছে। ভারত, রাশিয়া সহ বিশ্বের প্রায় ৪০ টি দেশের বায়ুসেনা ও নৌসেনা তে মিগ-২৯ সার্ভিসে আছে। দুই ইঞ্জিন বিশিষ্ট মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানটির সর্বোচ্চ গতি ২.২৫ ম্যাক বা ২৪০০ কিমি/ঘন্টা। রেঞ্জ ১৪৩০ কিমি। এতে অস্ত্র হিসাবে রয়েছে একটি ৩০ মিমি Gryazev-Shipunov GSh-30-1 অটোক্যানন। মিগ-২৯ এ সাতটি হার্ড পয়েন্ট রয়েছে যা এস-৫, এস-৮ ও এস -২৪ রকেট বহন করে। মিসাইল হিসাবে রয়েছে আর-২৭, আর-৬০, আর-৭৩ ও অস্ত্র এয়ার টু এয়ার মিসাইল। তাছাড়া মিগ-২৯ ছয়টি ৬৬৫ কেজি বোম্ব বহন করতে পারে।

ভারত ছিল মিগ-২৯ এর প্রথম বিদেশী ক্রেতা। ভারত মিগ-২৯ এর প্রাথমিক ভার্সন মিগ-২৯ এ কিনেছিল, পরে এগুলো কে মিগ-২৯ ইউপিজি ভার্সনে আপগ্রেড করা হয়। ১৯৮৫ সালে ভারতীয় বায়ুসেনাতে প্রথম মিগ-২৯ যুক্ত হয়। পাকিস্তানের এফ-১৬ কে কাউন্টার করতে ভারত এই মিগ-২৯ কিনেছিল। ভারত প্রথমে ৬৬ টি মিগ-২৯ কিনেছিল পরে আরও কিছু মিগ-২৯ কেনা হয়, যাদের মধ্যে কিছু বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়। শেষপর্যন্ত ৬৯ টি মিগ-২৯ কে আপগ্রেড করা হয়। ছয়টি মিগ-২৯ রাশিয়াতে আপগ্রেড করা হয়, বাকী ৬৩ টি মিগ-২৯ ভারতে হিন্দুস্তান এরোনটিকস লিমিটেড বা হ্যাল আপগ্রেড করেছে। ভারতীয় নৌসেনাতেও মিগ-২৯ কে ভার্সন ব্যবহার করা হয়। ভারতীয় নৌসেনার কাছে ৪৫ টি মিগ-২৯ কে আছে, ভারতের আইএনএস বিক্রমাদিত্য এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারে এই বিমান ব্যবহার করা হয়। মিগ-২৯ কে মিগ-২৯ এর নেভ্যাল ভার্সন, ফোল্ডিং উইং এর জন্য এগুলো এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারে ব্যবহার করা হয়।

আসুন জানা যাক মিগ-২৯ ইউপিজির ডিটেইলস সম্পর্কে :—

=> ঝুক এমই রেডার:- ইউপিজি ভার্সনে ব্যবহার করা হয়েছে ফেজাট্রনের ঝুক এমই রেডার যা মিগ-২৯ কে তেও ব্যবহার করা হয়েছে। তবে ইউপিজি ভার্সনে ব্যবহার করা হয়েছে ঝুক এমই রেডারের এম টু ই (M2E) ভার্সন এবং মিগ-২৯কে ভার্সনে ব্যবহার করা হয়েছে এম ওয়ান ই (M1E) ভার্সন। এম টু ই ভার্সন অনেক বেশী শক্তিশালী, এর প্রসেসিং পাওয়ার অনেক বেশী। এর রেঞ্জ ১২০ কিমি। এই রেডার একসাথে দশটি টার্গেট কে ট্রাক করতে পারে এবং চারটি টার্গেট কে এনগেজ করতে পারে। এয়ার টু গ্রাউন্ড রোলে এই রেডার ২৫ কিমি দূর থেকে একটি ট্যাংককে, ১২০ কিমি দূর থেকে একটি ব্রিজকে এবং ৩০০ কিমি দূর থেকে একটি জাহাজকে ডিটেক্ট করতে পারে। এটি + – ৮৫ ডিগ্রি এরিয়া কে স্ক্যান করতে সক্ষম এবং এলিভেশন মোডে +৫৬ থেকে -৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত স্ক্যান করতে সক্ষম। 

=> ওএলএস (OLS) সিস্টেম :– মিগ-২৯ ইউপিজি ভার্সনে ওএলএস বা অপটিক্যাল লোকেটারিং সিস্টেম রয়েছে। এর রেঞ্জ ৫৫ কিমি। এটা কীভাবে কাজ করে সেটা বলি শুনুন যখন কোন যুদ্ধবিমান অ্যাটাকে যায় তখন রেডার অন করে আশেপাশে শত্রু বিমান খুঁজতে থাকে। রেডারের ইলেকট্রনিক ওয়েভ আশেপাশের এরিয়া স্ক্যান করতে থাকে। এবার শত্রুর বিমানে থাকা রেডার ওয়ার্নিং রিসিভার এই সিগন্যাল রিসিভ করে পাইলট কে সতর্ক করে দেয়। এখানেই কাজ ওএলএস সিস্টেম। রেডার অফ করে ওএলএস সিস্টেম অন করে স্ক্যান করলে শত্রু বিমান বুঝতেও পারে না। অর্থাত ওএলএস সিস্টেম সাইলেন্ট কিলার হিসাবে কাজ করে। এই সিস্টেম ব্যবহার করে মিসাইল কে গাইড করা যায়।

=> ককপিট:- মিগ-২৯ ইউপিজি তে বিশেষ গ্লাস ককপিট ব্যবহার করা হয়েছে, তবে পুরোপুরি গ্লাস ককপিট না, বরং কিছু অ্যানালগ সিস্টেম ও রয়েছে।  এতে দুটি ৬×৮ সাইজের এলসিডি মাল্টিফাংশান ডিসপ্লে রয়েছে। তাছাড়া HOTAS বা হ্যান্ড, থ্রটাল এন্ড স্টিক সিস্টেম রয়েছে মানে বেশীরভাগ কন্ট্রোল পাইলট নিজের হাতে করতে পারে।

=> নতুন মিশন কম্পিউটার ইনস্টল করা হয়েছে। 

=> ফ্রান্সের স্যাফরনের সিগমা ৯৫ এন নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে, সুখোই ৩০ এমকেআই তেও এই নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে। 

=> নতুন ভিডিও রেকর্ডার সিস্টেম ও ডিসপ্লে ম্যাপ জেনারেটর ইনস্টল করা হয়েছে। 

=> EW সুইট :- মিগ-২৯ ইউপিজি তে ডিআরডিও এর তৈরি নতুন ডি-২৯ ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সুইট ব্যবহার করা হয়েছে।  ডিআরডিও, ইসরায়েলের এলিসরা ও ইটালির ইলেট্রনিকা যৌথভাবে এই সিস্টেম তৈরি করেছে।

=> পুরোনো ইন্জিনের বদলে RD-33 এর ৩ সিরিজের নতুন ইন্জিন লাগানো হয়েছে।

=> নতুন HMDS বা হেলমেট মাউন্টেন ডিসপ্লে সাইট ইনস্টল করা হয়েছে। এই সিস্টেমে পাইলট যে দিকে তাকাবে সেদিকে অটোমেটিক টার্গেট লক হয়ে যাবে। সম্ভবত ইসরায়েলের এলবিট সিস্টেমের তৈরি ড্যাশ HMDS ব্যবহার করা হয়েছে।

=> আপগ্রেডেশনের পর মিগ-২৯ আর-৭৭ ও অস্ত্র মার্ক ১ বহন করতে পারে। তাছাড়া KH-31 অ্যান্টি শিপ মিসাইল ও ইনস্টল করা হয়েছে।

আপগ্রেডেশনের আগে মিগ-২৯ সাধারণত এয়ার সুপিউরিটি রোলে ব্যবহার করা হত। সাধারণত পাকিস্তান সীমান্তে পেট্রোলিং এর কাজে মিগ-২৯ ব্যবহার করা হত। তবে ইউপিজি ভার্সন ইদানিং লাদাখে পেট্রোলিং এর কাজে ব্যবহার করা হয়। লাদখের মত হাই অল্টিটিউডে বাতাসের ঘনত্ব কম থাকে যার জন্য চীনের জে-১১ ও ভারতের সুখোই ৩০ এমকেআই এর মত হেভি যুদ্ধবিমান পুরো পেলোড নিয়ে উড়তে পারে না। কিন্তু মিগ-২৯ এর মতন মিডিয়াম ক্যাটেগরির বিমান এখানে সব পেলোড নিয়ে উড়তে পারে। যারজন্য মিগ-২৯ লাদাখের মত জায়গায় অত্যন্ত এফেক্টিভ।

আপনারা কী জানেন মিগ-২৯ ইসরায়েল ও আমেরিকাও ব্যবহার করে। শুনে হয়ত অবাক হয়ে গেছেন তাহলে ব্যাপারটা বলা যাক পুরো। ১৯৯৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর পনেরোটি স্বাধীন দেশ হয়। এইসব দেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের অনেক অস্ত্র ছিল যা ওইসব দেশ নিয়ে নেয়। এমনই একটা দেশ মলডোভা যা ইউক্রেন ও রোমানিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে। এই দেশটির কাছে ৩৪ টি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান, ৮ টি এমআই-৮ হেলিকপ্টার ও কিছু ট্রান্সপোর্ট বিমান ছিল। মলডোভার জনসংখ্যা এখন ৩৩ লাখ, তখন তো আরও কম ছিল। এত ছোট দেশের পক্ষে এতবড় বিমানবাহিনী রাখা সম্ভব ছিল না, অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া দেশটির পক্ষে। এইসময় আমেরিকা ৪০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ২১ টি মিগ-২৯ কিনে নেয়, কারন নাহলে মালডোভা এই বিমানগুলো আমেরিকার শত্রু দেশ ইরান কে বিক্রি করে দিত। ১৯৯৭ সালে ইসরায়েল পোল্যান্ড থেকে তিনটি মিগ-২৯ লিজ নেয় কারন রাশিয়া ইসরায়েলের শত্রু ইরাক ও সিরিয়া কে এই বিমান বিক্রি করে। ইসরায়েল ও আমেরিকা এই মিগ-২৯ এর পুরো অ্যানলিসিস করে।

মিগ-২৯ এর সমস্যা হচ্ছে এতে মাত্র সাতটি হার্ড পয়েন্ট রয়েছে, পশ্চিমা যুদ্ধবিমান গুলোতে ৯, ১১ এমনকী ১৩ টি হার্ড পয়েন্ট থাকে। তাছাড়া মিগ-২৯ এর RD-33 ইঞ্জিন প্রচুর স্মোক তৈরি করে, তাছাড়া এই ইন্জিন ৮০০ ঘন্টা ফ্লাইটের পরই রিপ্লেস করতে হয়, যা একটা সমস্যা। রাশিয়ান যেকোন যুদ্ধবিমানের সবচেয়ে বড় সমস্যা মেইনটেন্যান্স। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর রাশিয়া দুবার তাদের সমস্ত মিগ-২৯ কে গ্রাউন্ডেড করে রেখেছিল মেইটেন্যান্সের জন্য। 

ভারত রাশিয়া থেকে ২১ টি মিগ-২৯ ক্রয় করতে চলেছে। এগুলো আশির দশকে এয়ারফ্রেম তৈরি হয়ে পড়েছিল কোনওদিন ব্যবহার হয় নি। ভারত এগুলো কিনবে। তবে এগুলো তে ইউপিজি ভার্সনের থেকেও বেশী আপগ্রেড করা হবে যাকে সুপার ইউপিজি ও বলা হচ্ছে। সম্ভবত ইউপিজি ভার্সনে থাকা ঝুক রেডারের এসা ভার্সন বা ভারতীয় উত্তম এসা রেডার ইনস্টল করা হবে। তাছাড়া ভারতীয় মিশন কম্পিউটার ব্যবহার করা হবে যাতে ভবিষ্যতে ভারতীয় মিসাইল যেমন অস্ত্র মার্ক ২, এসএফডিআর, ব্রাহ্মস এনজি ইনস্টল করা সম্ভব হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.