ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু। দক্ষিন কোরিয়ার অত্যাধুনিক ৪.৫ জেনারেশন যুদ্ধবিমান পোগ্রাম

রাজেশ রায়:– সম্প্রতি দক্ষিন কোরিয়া সেই সব দেশ গুলোর মধ্যে একটি হয়েছে যারা নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য আধুনিক অস্ত্র তৈরি করছে তা সে লাইট অ্যাটাক এয়ারক্রাফটই হোক কিংবা হেলিকপ্টার। দক্ষিন কোরিয়া আর্টিলারি ও সাবমেরিন নির্মান ও করছে। সম্প্রতি দক্ষিন কোরিয়া তাদের নিজস্ব রকেটে করে নিজেদের তৈরি স্যাটেলাইট লঞ্চ করেছে। দক্ষিন কোরিয়া অস্ত্র রপ্তানিও করে। ভারত যে কে-৯ বজ্র হউতজার ব্যাবহার করে তা দক্ষিন কোরিয়ারই তৈরি। বর্তমানে দক্ষিন কোরিয়া তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু করেছে তা হচ্ছে একটি অ্যাডভান্সড ৪.৫ জেনারেশন যুদ্ধ বিমান তৈরি। এটা শোনা যাচ্ছে যে দক্ষিন কোরিয়া এই বিমনাটির প্রথম ফ্লাইট করতে চলেছে খুব শ্রীঘ্রই।

দক্ষিন কোরিয়ার এই ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধ বিমানটির নাম দেওয়া হয়েছে কাই কেএফ- ২১ বোরামেই বা একে কেএফ- এক্স ও বলা হয়। কোরিয়ান ভাষায় বোরামেই এর অর্থ হল বাজপাখি। তবে দক্ষিন কোরিয়া একা এই প্রজেক্টে কাজ করছে না। দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে ইন্দোনেশিয়া এই প্রজেক্টে যুক্ত আছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বায়ুসেনার জন্য এই বিমান তৈরি করা হচ্ছে তবে ভবিষ্যতে এই বিমান বিক্রি ও করা হবে। এই বিমানটি যেকোনও চতুর্থ প্রজন্মের বিমানের থেকে অ্যাডভান্সড ও স্টেলথি হবে কিন্তু পঞ্চম প্রজন্মের বিমানের মত এতে ইন্টারন্যাল ওয়েপনস বে থাকবে না বা এই বিমানটি তার ভিতরে অস্ত্র বহন করতে পারবে না। এর সাথে আবার কেউ ভারতের আমকার তুলনা করবেন না। আমকা মার্ক ১ পঞ্চম প্রজন্মের আরও অ্যাডভান্সড যুদ্ধবিমান এবং আমকা মার্ক ২ ৫.৫ প্রজন্মের বিমান হবে। 

২০০১ সালে তৎকালীন দক্ষিন কোরিয়ান প্রেসিডেন্ট কিম ডে জুং এই প্রজেক্টের ব্যাপারে ঘোষনা করে। দক্ষিণ কোরিয়ান বায়ুসেনার এফ- ফোর ডি/ই ফ্যান্টম ২ এবং এফ- ফাইভ ই/এফ টাইগার ২ বিমানের রিপ্লেসমেন্টের জন্য এই কেএফ এক্স তৈরি করা হচ্ছে। ২০০২ সালে এই বিমান তৈরির জন্য রিসার্চ শুরু হয়। তবে প্রথমের দিকে কোরিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ডিফেন্স অ্যানালিসিস এই প্রজেক্ট সম্পন্ন হবার ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল। এই প্রজেক্ট শুরু হতে প্রচুর দেরী হয় কারন অত্যাধিক খরচের কারনে। ২০১০ সালের ১৫ জুলাই ইন্দোনেশিয়া এই প্রজেক্টে যোগ দেয় এবং প্রজেক্টে ২০ শতাংশ শেয়ার ইন্দোনেশিয়া নেয়। প্রাথমিক ভাবে ঠিক হয়েছে ১৫০-২০০ টি কেএফ- এক্স তৈরি করা হবে যার ৫০ টি ইন্দোনেশিয়া কিনবে। তুরস্কও ২০ শতাংশ শেয়ার কিনতে চেয়েছিল কিন্তু তুরস্ক এই প্রজেক্ট অনেক বেশী নিয়ন্ত্রনে রাখতে চাইছিল যার জন্য দক্ষিণ কোরিয়া রাজি হয় নি। দক্ষিণ কোরিয়ান সরকার এই প্রজেক্টের ৬০ শতাংশ খরচ বহন করছে এবং বাকী ২০ শতাংশ খরচ স্থানীয় প্রাইভেট সংস্থা গুলো বহন করছে। কোরিয়ান এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ বা কেএআই এই বিমান তৈরির দায়িত্বে আছে এবং আমেরিকার বিখ্যাত এরোস্পেস জায়েন্ট লকহিড মার্টিন কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে এই বিমানের জন্য। ২০২৬ সালে এই বিমানের প্রথম উড়ান হবার লক্ষ রাখা হয়েছে। কাই-টি-৫০ এর পর এটা দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিতীয় যুদ্ধ বিমান প্রজেক্ট। 

এই প্রজেক্টের প্রাথমিক লক্ষ ছিল একটি সিট ও দুটি ইঞ্জিন বিশিষ্ট এমন একটি মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান তৈরি করা যা ফ্রান্সের ড্যাসল্ট রাফায়েল এবং ইউরোপের ইউরো ফাইটার টাইফুনের থেকেও শক্তিশালী হবে। কিন্তু এই বিমানের সক্ষমতা আমেরিকার এফ-৩৫ লাইটনিং ২ এর থেকে কম হবে। এই বিমানের ওয়েপনস সিস্টেমের রিসার্চ করছে দক্ষিণ কোরিয়ার কনকুক ইউনিভার্সিটি। কেএফ-এক্স আমেরিকার লিজেন্ডারি এফ-১৬ এর তুলনায় অনেকটাই আধুনিক হবে। এফ-১৬ এর তুলনায় কেএফ- এক্সের কমব্যাট রেঞ্জ ৫০ শতাংশ বেশী, ৩৪ শতাংশ বেশী জীবনকাল। কেএফ-এক্সের এসা রেডার, ডাটা লিংক, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সুট, অ্যাভনিকস এফ-১৬ এর তুলনায় অনেক উন্নত। এর দুই ইন্জিন থেকে সুপারসনিক ও ক্রুজের জন্য ৫০,০০০ পাউন্ড থ্রাস্ট উৎপন্ন করারা কথা ছিল কিন্তু এইসব বৈশিষ্ট্যের কারনে প্রজেক্টে খরচ অত্যাধিক বেড়ে যাচ্ছিল যার জন্য রিপাবলিক অফ কোরিয়ান এয়ারফোর্স বিমানটির কীছু বৈশিষ্ট্য কমিয়ে একে ৪.৫ জেনারেশন যুদ্ধ বিমান তৈরি করার কথা বলেছে যাতে স্টেলথ বৈশিষ্ট্য সীমিত থাকবে। এই বিমানের ৬৫ শতাংশ প্রযুক্তি দক্ষিন কোরিয়ার নিজস্ব। বাকী প্রযুক্তি বিভিন্ন দেশের থেকে নেওয়া হচ্ছে যার মধ্যে আমেরিকা অন্যতম। কেএফ-এক্স তৈরির জন্য এর ডিজাইনের জন্য তিনটি কনসেপ্ট নেওয়া হয়। সি-১০৩ যা দেখতে আমেরিকার এফ-৩৫ এর মতন, সি-২০৩ যা দেখতে ইউরোপীয়ান যুদ্ধবিমান গুলোর মতন। সি-৫০১ নামেও একটি ডিজাইন তৈরি করা একটি ইঞ্জিন বিশিষ্ট বিমান হিসাবে কিন্তু এটির বিশেষত্ব এফ-১৬ এর তুলনায় কম হওয়ায় এই ডিজাইন বাতিল করা হয়। ২০১৪ সালে টেকনোলজির জন্য লকহিড মার্টিনের সাথে চুক্তি হয় এবং সি-১০৩ ডিজাইনটি সিলেক্ট করা হয়। লকহিড মার্টিন এফ-৩৫ এ এর প্রায় ২৪ টি টেকনোলজি এই বিমানে যুক্ত করছে। তবে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ বিমানের জন্য দরকারী চারটি বড় প্রযুক্তি এসা রেডার, ইনফ্রারেড সার্চ এন্ড ট্রাক সিস্টেম, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সী জ্যমার এবং ইলেকট্রো অপটিক্যাল টার্গেট পড দেবে না আমেরিকা। 

জুন,২০১৮ তে বিমানটির ফাইনাল ডিজাইন সম্পন্ন করা হয় এবং ততদিন পর্যন্ত ৮৭ শতাংশ টেকনোলজি তৈরি করা হয়েছিল। ২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ান সরকার জানায় এই প্রজেক্টে খরচ প্রায় ৮.০১ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বর, ২০২০ আসতে আসতে ইন্দোনেশিয়া এই প্রজেক্টে ২০৫ মিলিয়ন ডলার দেয়। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া তার ভাগের ২০ শতাংশ অর্থায়নে ব্যার্থ এখনও অবধি সেজন্য এটা ধারনা করা হচ্ছে ভবিষ্যতে হয়ত এই প্রজেক্ট থেকে ইন্দোনেশিয়াকে বের করে দেওয়া হবে। তবে এটা দক্ষিণ কোরিয়া ও ইন্দোনেশিয়াট যৌথ প্রজেক্ট বলা হলেও ইন্দোনেশিয়া এখানে জড়িত নেই বললেই চলে। দক্ষিণ কোরিয়া আমেরিকার জেনারেল ইলেকট্রিকের সাথে চুক্তি করেছে এফ-৪১৪ ইন্জিনের জন্য যা এই বিমানে ব্যবহার করা হবে। ভারত তার আমকা মার্ক ১ এও এই ইন্জিন ব্যবহার করবে ঠিক করেছিল কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে আমেরিকার বদলে ভারত ব্রিটেনর রোলস রয়েস অথবা ফ্রান্সের স্যাফরনের কাছ থেকে ইঞ্জিন কিনবে। ইসরায়েলের এল্টা সিস্টেম ও দক্ষিণ কোরিয়ার হানওয়া সিস্টেম যৌথ ভাবে এই বিমানের জন্য এসা রেডার তৈরি করছে। এছাড়া সুইডেনের সাব গ্রুপ, ইসরায়েলের এলবিট সিস্টেম সহ একাধিক বিদেশী সংস্থা এই প্রজেক্টে কারিগরি সহায়তা করছে। এবার কেএফ এক্সের কীছু সাধারন বৈশিষ্ট্য জানা যাক। এটি ১৬.৯ মিটার লম্বা। এতে আমেরিকার জেনারেল ইলেকট্রিকের দুটি এফ-৪১৪ ইন্জিন থাকবে যার প্রতিটি ৯৮ কিলো নিউটন থ্রাস্ট উৎপন্ন করতে সক্ষম। এর সর্বোচ্চ গতি ১.৮১ ম্যাক। এর রেঞ্জ ২৯০০ কিলোমিটার। এই বিমানে মোট ১০ টি হার্ড পয়েন্ট রয়েছে যার মধ্যে ছয়টি বিমানের ডানার নীচে এবং চারটি বিমানের প্রধান বডির নীচে। এতে অস্ত্র হিসাবে থাকতে পারে :– এমবিডিএর মিটিওর মিসাইল, আমেরিকার এইম ১২০ আমরাম এবং এইম ৯এক্স সাইড উইন্ডার মিসাইল। এগুলো সবই এয়ার টু এয়ার মিসাইল।  এয়ার টু গ্রাউন্ড মিসাইল হিসাবে থাকবে আমেরিকার এজিএম-৬৫ মাভেরিক মিসাইল। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া বিভিন্ন রেঞ্জের নিজস্ব মিসাইল তৈরি করছে যা ভবিষ্যতে এই বিমানে যুক্ত করা হবে।

তবে এই বিমানকে ঘিরে কীছু বিতর্ক রয়েছে। যেমন ২০০৯ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার বায়ুসেনার এক জেনারেলকে গ্রেপ্তার করা হয় কারন সে টাকার বিনিময়ে এই প্রজেক্টের অনেক গোপন তথ্য সুইডেন সাব কোম্পানিকে বিক্রি করে দিয়েছিল। এছাড়াও আরও একটি বিদেশী সংস্থা এই প্রজেক্টের তথ্য পেয়ে গিয়েছিল যার জন্য এই প্রজেক্টের ডিজাইন সহ অনেক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে হয়েছিল যাতে প্রজেক্টের খরচ অন্তত ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। কোরিয়ার অনেক বিশেষজ্ঞ এই পোগ্রাম সম্পর্কে বলে যে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে এই অ্যাডভান্সড বিমান তৈরি করবার মতন প্রয়োজনীয় টেকনোলজি নেই। তাছাড়া এই প্রজেক্টের অত্যাধিক খরচ নিয়ে সমালোচনা করা হয়। বলা হচ্ছে একটি কেএফ- এক্স বিমানের দাম আমেরিকার এফ-১৬ এর সর্বাধুনিক ভার্সন এফ-১৬ ব্লক ৭০ এবং জাপানের মিতসুবিশি এফ-২ এর দামের দ্বিগুন। ২০১৩ সালের ২৩ মে এয়ারবাস দক্ষিণ কোরিয়াকে জানায় তারা যদি ইউরো ফাইটার টাইফুন কেনে তাহলে তারা এই প্রজেক্টে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে কিন্তু দক্ষিন কোরিয়া এফ-৩৫ এ কেনে। এয়ারবাস তখনও জানায় যদি দক্ষিণ কোরিয়া ৪০ টি টাইফুন এবং ২০ টি এফ-৩৫ এ কেনে তাহলেও তারা বিনিয়োগ করতে রাজি কিন্তু দক্ষিন কোরিয়া ২০১৭ এর সেপ্টেম্বরে ৪০ টি এফ-৩৫ এ কেনার সিদ্ধান্ত নেয়, যার ফলে এয়ারবাস এই প্রজেক্ট থেকে সরে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.