জিও পলিটিক্সে নতুন সমীকরন, দীর্ঘদিনের বন্ধু শ্রীলঙ্কার থেকে কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে চীন?

রাজেশ রায়:– উনিশ এবং বিশ শতকে বিশ্বয়ানের যুগ শুরু হয়, এই সময় দেশ গুলির বিদেশনীতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছিল। উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশ গুলো একে অপরের উপর নির্ভরতার মাধ্যমে শুধু নিজেদেরই না বরং গোটা বিশ্বেরই সার্বিক উন্নতি হচ্ছিল। বিভিন্ন দেশ নিজেদের মধ্যে বানিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। উন্নয়নশীল দেশ গুলো উন্নত দেশ গুলো থেকে নতুন টেকনোলজি পায় বদলে উন্নত দেশ গুলো তাদের পন্যের জন্য নতুন বাজার পায় এবং মুনাফা লাভ হতে থাকে। কিন্তু একটা কথা সবসময় মাথায় রাখা দরকার আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু বলে কিছু হয় না। যতক্ষন কোন দেশ অন্য দেশ থেকে সুবিধা পাচ্ছে ততক্ষন সেই দেশের সাথে বন্ধুত্ব রাখে। স্বার্থ শেষ হলেই কেউ ফিরেও তাকায় না। যার সবচেয়ে বড় উদাহারন সাম্প্রতিক কালের ইউক্রেন। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে আজ কোন বড় দেশ ইউক্রেনকে সরাসরি সাহায্য করছে। একই দৃশ্য শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও খাটে। না শ্রীলঙ্কায় ইউক্রেনের মত কোন বড় যুদ্ধ হয়নি কিন্তু শ্রীলঙ্কা বর্তমানে আর্থিক ভাবে দেওলিয়া। অবস্থা এতটাই খারাপ যে লোন শোধ করবার জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা নেই শ্রীলঙ্কার। এমন পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কার বিশেষ বন্ধু চীন শুধু সহানুভূতি দেখিয়েই চলে যাবার চেষ্টা করছে। চীনের এরকম অবস্থার জন্য কী শ্রীলঙ্কা নিজেই দায়ী?? নাকী চীন বিশেষ কোন কারনে শ্রীলঙ্কা থেকে চলে যেতে চাইছে?

গত কয়েকমাস ধরেই শ্রীলঙ্কার অবস্থা খুব খারাপ, যতদিন যাচ্ছে অবস্থা খারাপ হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা কমতে কমতে একবারে তলানিতে ঠেকেছে। করে অত্যাধিক ছাড়, হঠাৎ করেই কোন পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই দেশে অর্গানিক চাষ শুরু করার চেষ্টা, কোভিড-১৯ এর জন্য পর্যটন ও রেমিট্যান্সে ক্ষতি এবং অত্যাধিক মূল্যে চাল কেনার জন্য আজ শ্রীলঙ্কার এই অবস্থা।  এর জন্যই শ্রীলঙ্কা আজ দেনায় জর্জরিত হয়ে গেছে। প্রায় ৫১ বিলিয়ন ডলারের লোন রয়েছে শ্রীলঙ্কার। এর জন্য শ্রীলঙ্কা আই এম এফ বা ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ডের কাছে সহায়তা চেয়েছে। গত মার্চ মাস অবধি ভারত ও অনেক সহায়তা করেছে। ভারত শ্রীলঙ্কাকে ১ বিলিয়ন ডলারের ক্রেডিট ফেসিলিটি, ৫০০ মিলিয়ন ডলারের লাইন অফ ক্রেডিট, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াতে ৪০০ মিলিয়ন কারেন্সি এক্সচেন্জ এবং ৫০০ মিলিয়ন ডলারের লোন দিয়েছে ভারত। এছাড়াও জ্বালানি তেল, খাদ্য, ওষুধ ভারত শ্রীলঙ্কাকে সরবরাহ করছে। শ্রীলঙ্কার মোট লোনের মধ্যে ১১ বিলিয়ন ডলার শুধু চীনের বিআরআই প্রজেক্টের জন্য হয়েছে। এখন যখন বিপদে পড়ে চীনের কাছে ২.৫ বিলিয়ন ডলারের লোন চেয়েছে শ্রীলঙ্কা তখন চীন জরুরী প্রয়জনে সাহায্য হিসাবে মাত্র ৩১ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে। তবে এই টাকাও সরাসরি শ্রীলঙ্কার হাতে দিচ্ছে না চীন বরং এই টকায় ৫০০০ টন চাল, ওষুধ সহ জরুরী প্রয়জনীয় জিনিস দিচ্ছে। তবে এই মহূর্তে শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে বেশী দরকার হচ্ছে অর্থ। চীনের এসব জিনিসে হয়ত কিছু মানুষের একটু সুবিধা হবে। চীনের এই ব্যাবহারে বিদেশনীতিবিদ রাও অবাক কারন চীন বিগত কয়েক বছর ধরে শ্রীলঙ্কার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময় থেকেই চীন ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে বন্ধুত্বের শুরু। ৬.৫ বিলিয়ন ডলার লোন দিয়েছে শ্রীলঙ্কাকে চীন যার জন্য চীনকে শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে বড় লোনদাতা বলা হয়। এমনকী গত ২০২০ তেও চীন শ্রীলঙ্কাকে ১.৫ ডলার কারেন্সি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ১ বিলিয়ন ডলার লোন দিয়েছিল। তাহলে মনে হতে পারে মাত্র দুই বছরে এমন কী হল যে চীন শ্রীলঙ্কার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে?? এবার এব্যাপারে জানা যাক।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য গত কয়েক বছর ধরে চীন তাদের বাইরের দেশকে লোন দেবার নীতি সম্পর্কে বিশ্লেষন করছে কারন চীনের ব্যাঙ্ক গুলো লক্ষ করেছে তারা এমন অনেক দেশকে প্রচুর লোন দিয়ে রেখেছে যাদের লোন শোধ করবার ক্ষমতা খুবই কম। জীবুতি, লাওস, কম্বোডিয়া, কাজাখিস্তান, তাজাকিস্তান, পাকিস্তান, মন্টেনেগ্রো, মঙ্গোলিয়া এই আটটি দেশকে চীন তাদের উচ্চাভিলাষী বিআরআই প্রজেক্টের জন্য প্রচুর লোন দিয়েছে। এই সমস্ত দেশ গুলো চীনের ডেব্ট ট্রাপ ডিপ্লোম্যাসি তে আটকে পড়েছে। এই নীতি অনুযায়ী চীন ছোট ছোট দেশ যাদের লোন শোধ করবার তেমন ক্ষমতা নেই তাদের প্রচুর লোন দেয় এবং যদি দেশ গুলো লোন শোধ করতে না পারে তাহলে তাদের কীছু জমি নির্দিষ্ট বছরের জন্য লিজ নিয়ে নেয়। যেমন শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর চীন ৯৯ বছরের জন্য লিজ নিয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে এই দেশ গুলো থেকে টাকা না ফেরত পেলে চীনের লোকসানও হবে প্রচুর। সেজন্য আপাতত চীন শ্রীলঙ্কার থেকে দুরত্ব বজায় রাখছে। চীন এটাও ভাবছে যদি তারা শ্রীলঙ্কাকে লোন দেয় তাহলে হয়ত বাকী দেশ গুলোও এর সুবিধা নিয়ে দেওলিয়া হলে চীনের কাছেই লোন চাইবে। এছাড়া বর্তমানে চীনের অর্থনীতি একটু হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেজন্য চীন এই মহূর্তে নতুন করে লোন দেওয়া থেকে পিছিয়ে আসছে। কোভিড মহামারীর কারনে চীনের ভালই অর্থনৈতিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

চীনের টেকনোলজি সেন্টার, চীনের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু সাংহাই অবধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২২ আসতে আসতে চীনের রিটেল সেল ৭ শতাংশ কমে গেছে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২১ এ যেখানে চীনের আর্থিক বৃদ্ধি ৮ শতাংশ ছিল সেখানে ২০২২ এ চীনের আর্থিক বৃদ্ধি ৫.৫ শতাংশ হবে। মে মাসে চীন ১.৮৯ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বা ২৮১ বিলিয়ন ডলার নতুন লোন দেবার জন্য অনুমোদন দিয়েছে যার মধ্যে ৩৮ শতাংশই স্বল্প মেয়াদে, যার অর্থ লং টার্ম লোন চীন একটু হলেও এড়িয়ে যাচ্ছে। আমেরিকার কলেজ অফ উইলিয়াম এবং ম্যারিস এইডডেটা গ্রুপের রিপোর্ট অনুযায়ী চীন তাদের বিআরআই প্রজেক্ট নিয়ে চিন্তিত কারন নিম্ন ও মধ্য অর্থনীতির দেশ গুলোতে দুর্নীতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং খারাপ আর্থিক অবস্থার জন্য বিআরআই এর মত প্রজেক্টে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তবে কীছু বিশেষজ্ঞ মনে করছে শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে চীন তাদের ডেব্ট টু ইকুইটি স্ট্রাটেজি নিতে চলেছে মানে শ্রীলঙ্কায় চলা চীনের প্রজেক্ট গুলোতে চীন তাদের লোনের সমপরিমান মালিকানা নিজেদের রাখতে চাইছে। তবে অনেকেই এই ধারনা উড়িয়ে দিয়েছে, তাদের ধারনা হাম্বানটোটা বন্দর লিজ নিয়েও চীনের তেমন কীছু লাভ হচ্ছে না যার জন্য চীন শ্রীলঙ্কা থেকে বেড়িয়ে যেতে চাইছে। 

চীনের সাথে শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক খারাপ হবার আরও একটি বড় কারন হচ্ছে এফটিএ বা চীন শ্রীলঙ্কা ফ্রী ট্রেড এগ্রিমেন্ট। ২০১৫ থেকে চীন শ্রীলঙ্কার সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করছে কিন্তু এই পক্রিয়া এতটাই ধীর গতিতে এগোচ্ছে যে চীন এবার বিরক্ত হয়ে পড়ছে। গত ২২ এপ্রিল চীন শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি গোটাবায়া রাজপক্ষে কে জানিয়েছে ভবিষ্যতে চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করতে হলে এফটিএ সাইন করতেই হবে। আসলে বলা হচ্ছে শ্রীলঙ্কার সরকারে বসে থাকা রাজাপক্ষে পরিবারের সদস্যরাই এই চুক্তি প্রক্রিয়া ধীর গতির করে দিয়েছে কারন। শ্রীলঙ্কায় বহু শিল্প প্রতিষ্ঠান চালায় রাজাপক্ষে পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু তাদের পরিকাঠামো খুবই পুরোনো, এমনকী কীছু কীছু জায়গার পরিকাঠামো ব্রিটিশ আমলের। তাই যদি চীনের সাথে এফটিএ সাইন হয় তাহলে শ্রীলঙ্কার বাজারে চীনা পন্যের ঢল নামবে এবং সরাসরি রাজাপক্ষে পরিবারের ওই ব্যাবসা গুলো টিকতে পারবে না প্রতিযোগিতায় তাই ইচ্ছে করেই তারা এই চুক্তি পক্রিয়া ধীরে করে দিচ্ছে। ২০১৩ থেকে চীন বিআরআই প্রজেক্টে শ্রীলঙ্কাতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। যাতে রাস্তা, এয়ারপোর্ট, বন্দর নির্মান সব হয়েছে। হাম্বানটোটা সহ কলম্বো বন্দরের কাজ ও চীন করছিল কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ধীর গতিতে কাজ হবার জন্য চীন এখান থেকে এখনও লাভের মুখ দেখেনি যার জন্য চীন শ্রীলঙ্কার উপর উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.