বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী পরমাণু বোম্বের জনক রবার্ট ওপেনহাইমার ও তাঁর ভগবত গীতার উপর প্রেম

রাজেশ রায়:– ভগবত গীতা ওনাকে এতটাই আকর্ষন করেছিল যে আসল ভগবত গীতা পড়বার জন্য উনি পুরো সংস্কৃত ভাষাই শিখে ফেলেছিলেন। ওনাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী বলা হত, যদি উনি পরমানু বোম্ব তৈরির প্রজেক্টের নেতৃত্ব গ্রহন না করত তাহলে হয়ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফল আজকে অন্য হত। হিটলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জিতে যেত এবং পৃথিবীর ভবিষ্যত ধ্বংসাত্মক হত। তবে এখনও পৃথিবী জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এতক্ষন নিশ্চয় একটু ধারণা করেছেন কার সম্পর্কে বলছি? বিংশ শতাব্দীর মহান বিজ্ঞানী জুলিয়াস রবার্ট ওপেনহাইমার সম্পর্কে বলা হচ্ছে, যিনি বিশ্বে প্রথম পরমানু বোম্ব তৈরি করেন। পরমানু বোম্ব বিস্ফোরনের পর তিনি গীতার একটি শ্লোক বলেছিলেন। নিজে ডিপ্রেশনের থেকেও রবার্ট ওপেনহাইমার বিশ্বকে এগিয়ে যাবার জন্য প্রেরনা দিয়েছিলেন। ডিপ্রেশন মানেই যে নেগেটিভ কাজ করতে হবে তা তার কোন মানে নেই, এটাই তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন। আজ সেই রবার্ট ওপেনহাইমার সম্পর্কে আলোচনা করব এবং তার জীবনে ভগবত গীতার প্রভাব সম্পর্কেও বলা হবে।

সময়টা তখন আমেরিকায় গৃহ যুদ্ধের শেষের পর। তখন আমেরিকা দ্রুত গতিতে নিজেদের উন্নয়ন শুরু করে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার আমেরিকা কোনও দেশে উপনিবেশ না বানিয়ে নিজেরাই পরিশ্রম করতে থাকে। মাত্র ১২ বছরে আমেরিকা ১.৫ লাখ কিলোমিটার লম্বা রেললাইন তৈরি করে। সেসময় বহু ইউরোপীয়ান আমেরিকায় চলে আসে। এদের মধ্যে দুজন হলেন জুলিয়াস ও বেলা ওপেনহাইমার। নিউইয়র্কের একটি মিলে কাজ শুরু করেন জুলিয়াস ওপেনহাইমার। ১৯০৫ সালের ২২ এপ্রিল তাদের ছেলে রবার্টের জন্ম হয়, ততদিনে আমেরিকার এক ধনী ব্যাবসায়ী হয়ে উঠেছেন জুলিয়ান ওপেনহাইমার এবং নিউইয়র্কে নিজের একটি বাংলো কিনে নেন তিনি। ছোট থেকেই রবার্ট খুব বুদ্ধিমান ছিলেন, তার মেধা এতটাই ছিল যে তিনি একসাথে তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেড এবং অর্ধেক বছরে অষ্টম গ্রেডের শিক্ষা সম্পন্ন করেন। সাহিত্য ও ধাতুবিদ্যার উপর সবচেয়ে বেশী ঝোঁক ছিল রবার্টের। একবার গ্রীষ্মের ছুটিতে ওনার গোটা পরিবার জার্মানি বেড়াতে যায় তখন রবার্টের দাদু বিভিন্ন রকম পাথর ভর্তি একটি বক্স তাকে দেন সেই থেকেই ধাতুর উপর আগ্রহ জন্মায় তার। এই আগ্রহ এতটাই বেশী হয় যে তিনি মাত্র ১১ বছর বয়সেই নিউইয়র্কের মিনারোলজিক্যাল ক্লাবের সদস্য হন। তার একবছর পরই ১২ বছর বয়সে ক্লাবে ধাতুর উপর একটি বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রতিবেদন লিখেছিলেন তিনি। 

আমরা সাধারনত ছোট বেলার স্মৃতি তে আমাদের অনেক বন্ধুর কথা ভাবি কিন্তু রবার্টের সে সৌভাগ্য হয় নি। অসাধারন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও শান্ত স্বভাবের জন্য স্কুল জীবনে তার কোনও বন্ধু হয় নি, তিনি তার ইংরেজি শিক্ষককে বলেছিলেন স্কুলে তিনি খুব একা বোধ করেন। স্কুলে শিক্ষা সম্পন্ন করে উচ্চতর রসায়ন শিক্ষার জন্য তিনি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ভর্তি হন। ভারতে মানুষ সাধারণত বিজ্ঞান কে গুরুত্ব বেশী দেয় এবং আর্টসকে একটু নীচু চোখে দেখা হয় কিন্তু সেসময় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নিয়ম ছিল যে সায়েন্সের কোন ছাত্র কে আর্টস, দর্শন এসব পড়তেই হবে। রবার্ট ও এসব পড়েন এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সম্মানীয় ডিগ্রি সুমা কাম লড নিয়ে তিনি পাস করেন এবং আরও উচ্চ শিক্ষার জন্য কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে তিনি আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের অধীনে কাজ করবার জন্য আবেদন করেন। ইনিই সেই বিখ্যাত রাদারফোর্ড যিনি পরমানুর নিউক্লিয়াস, প্রোটন, নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের আলফা ও বিটা আবিষ্কার করেন। 

পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত ফিজিক্স ল্যাব হচ্ছে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভানডিস ল্যাব। রাদারফোর্ড প্রথমে রবার্টকে তার অধীনে নিতে চাননি কিন্তু হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্টের প্রফেসর পার্সি ব্রিজম্যান একটি চিঠি লেখেন। তখন কেমব্রিজের আরও একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী জে জে থমসন, যিনি ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন, রবার্টকে একটি চাকরি অফার করেন। কিন্তু থমসন একটি শর্ত দিয়েছিলেন যে রবার্টকে তার ল্যাবের সব কাজ করতে হবে। প্রচুর কাজের চাপে খাওয়া দাওয়া প্রায় ভুলে গিয়ে চেইন স্মোকার হয়ে গিয়েছিলেন রবার্ট এবং তার ওজনও অনেক কমে যায়। ১৯২৬ সালে কেমব্রিজ ছেড়ে জার্মানির বিখ্যাত গটিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন রবার্ট। গটিগান ইউনিভার্সিটির ফিজিক্স বিভাগ তখন এনরিকো ফার্মি, ওয়েরনার হাইসেনবাগ, উল্ফগ্যাং পলি এবং এডওয়ার্ড টেলরের মতন বিখ্যাত কোয়ান্টাম ফিজিক্স  বিজ্ঞানীরা ছিলেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে ১৬ টি রিসার্চ পেপার তৈরি করেন তিনি। এরপর আমেরিকায় ফিরে এসে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়াতে পড়ানো শুরু করেন তিনি।  তার কোয়ান্টাম ফিজিক্স এতটাই প্রিয় ছিল যে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়াতেন কিন্তু ছোট থেকে কারও সাথে না মেশার ফলে ওনার কমিউনিকেশন স্কিল খুবই খারাপ ছিল যার জন্য ওনার ক্লাস ছাত্ররা করতেই চাইতেন না, এমনও হয়েছে কখনও ওনার ক্লাসে মাত্র একজন স্টুডেন্ট আসতেন। এর জন্য পরে তিনি পড়ানোর জন্য বিশেষ ট্রেনিং নেন। আমেরিকার নাট্য জগতে একটি বিখ্যাত নাম হচ্ছে ফ্রান্সিস ফারগুসন, তার একটি বিখ্যাত বই হচ্ছে দি আইডিয়া অফ থিয়েটার। ফ্রান্সিস রবার্টের অনেক ভাল বন্ধু ছিল। 

১৯৩০ এর পর রীতিমোতো ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলেন রবার্ট। অবস্থা এমন হয়েছিল যে যখন ফ্রান্সিস রবার্টকে বলে যে সে তার প্রেমিকাকে বিয়ে করবে তখন রবার্ট তার গলা টিপে ধরেছিল। এই ঘটনার পর সাইক্রিয়াটিস্টকে দেখায় রবার্ট।  রবার্টের তখন সাহিত্য বিভাগের এক প্রফেসরের মেয়ে জিম টেটলকের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। দুজনের রাজনৈতিক চিন্তাধারা একই রকম ছিল, দুজনেই কমিউনিজমকে ভালবাসত। কিন্তু রাশিয়া স্ট্যালিনের অত্যাচারের কথা শুনে রবার্ট কমিউনিজম ছোড়ে দেয় তখন তার জিম টেটলকের সাথে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। ১৯৪০ সালে ক্যাথরিন নামে এক মেডিক্যাল রিসার্চারকে বিয়ে করেন রবার্ট। ইউরোপে তখন হিটলারের অত্যাচার চলছে, ইহুদিদের ধরে ধরে হত্যা করছে হিটলার যাকে হলোকাস্ট বলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একবছর আগে ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বরে দুজন জার্মান বিজ্ঞানি অটোহান এবং ফ্রিটজ স্ট্রাসম্যান নিউক্লিয়ার ফিউসন আবিষ্কার করে। এই নিউক্লিয়ার ফিউসনই পারমানবিক বোম্ব তৈরির প্রধান পক্রিয়া। এই পদ্ধতিতে একটি ইউরেনিয়ামকে একটি নিউট্রন দ্বারা আঘাত করে দুটি ভাগ করা হয়। এতে প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয়। তিনজন হাঙ্গেরিয়ান বিজ্ঞানী লিও সিজলাড, এডওয়ার্ড টেলর ও ইউগিনি উইঙ্গার এটা ভয় খাচ্ছিলেন যে এই টেকনোলজি যদি হিটলারের হাতে চলে যায় তাহলে সমূহ বিপদ হয়ে যাবে। এর সবাই জাতে ইহুদী ছিল। সেজন্য তারা আমেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টকে চিঠি লিখবে ভাবে কিন্তু রুজভেল্ট তাদের কথা মানবেন কেন সেজন্য তারা অ্যালবার্ট আইনস্টাইনকে চিঠি লেখেন যার মাধ্যমে রুজভেল্ট সব জানতে পেরে একটি বিশেষ টিম তৈরি করে। লেসলি গ্রোভসের নেতৃত্বে শুরু হয় প্রজেক্ট ম্যানহ্যাটেন যার উদ্দেশ্য পরমানু বোম্ব তৈরি করা। এই প্রজেক্টের চীফ করা হয় রবার্ট ওপেনহাইমারকে। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে শহরে এই প্রজেক্ট শুরু হয়, শহরের নামেই প্রজেক্টের নাম করা হয় যাতে লোকে ভাবে হয়ত কোনও কনস্ট্রাকশন প্রজেক্ট চলছে। লিও সিজলাড, এনরিকো ফার্মি, আইনস্টাইন, এডওয়ার্ড টেলর, রিচার্ড ফেমেন সহ পনেরো জন বিজ্ঞানীকে নিয়ে একটি টিম তৈরি করা হয় যার প্রধান ছিলেন রবার্ট ওপেনহাইমার। এডওয়ার্ড টেলরকে হাইড্রোজেন বোম্বের জনক বলা হয়।

এই পুরো প্রজেক্টর জন্য ফাঁকা জনমানবশূন্য কোন জায়গা দরকার ছিল। রবার্ট ওপেনহাইমার ছোট বেলায় পরিবারের সাথে নিউ মেক্সিকোর অ্যালামাসে বেড়াতে যেত সেখানেই টেস্টিং ফেসিলিটি তৈরি করা হয় নাম দেওয়া হয় ট্রিনিটি বা ভগবান ও তার পুত্র যিশুখ্রিস্টের পবিত্র আত্মা। ১৯৪২ সালে অ্যালামাসে এই প্রজেক্টে ১০০ জন ছিল কিন্তু ১৯৪৫ আসতে আসতে সংখ্যা বেড়ে ৬০০০ হয়ে যায়। ১৯৪৫ সালের ১২ জুলাই এই বোম্ব টেস্টিং এর কথা ছিল। কিন্তু ১২ এপ্রিল মাথায় হ্যামারেজের কারনে হঠাৎ মারা যায় রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট। উপরাষ্ট্রপতি হেনরি ট্রুম্যান দায়িত্ব নিয়ে প্রজেক্ট এগোতে বলে। ১২ জুলাই সকালে বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোম্ব টেস্ট করা হয়। বোম্ব বিস্ফোরনে এতটা প্রবল শক্তি উৎপন্ন হয় যা দেখতে পুরো মাশরুমের মতন এবং মনে হচ্ছিল কয়েক হাজার সূর্যের মতন। যা দেখে আচমকা রবার্ট ওপেনহাইমারে মুখ থেকে ভাগবত গীতার ১১ চ্যাপ্টারের ১২ তম শ্লোক সংস্কৃত ভাষায় বেড়িয়ে আসে যে দিবি “সূর্যসহস্রস্য ভবেদ্যুগপাদদুত্তিতা যদি ভাঃ অনুরূপ সা স্যাদ্ভস্তস্য মহাত্মনঃ”. যার অর্থ যদি আকাশে সহস্র সূর্য একসাথেও প্রকাশিত হয় তবুও তা পরমাত্মার রূপের কাছে কীছুই নয়। এরপর ১২ চ্যাপ্টারের ৩২ তম শ্লোক পড়েন তিনি যার অর্থ ছিল এখন আমি মৃত্যু হয়ে গেছি যা সবকিছু ধ্বংস করতে সক্ষম। তিনি অনেকবার বলেছেন ভগবত গীতা তার জীবনকে পুরো পাল্টে দিয়েছে। অনেকে বলেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের শেষকৃত্যেও তিনি ভগবত গীতার শ্লোক পড়েছিলেন। বলা হয় এই বোম্ব টেস্টিং এর পর তিনি অনেকটা চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। এরপর ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট এবং ৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে লিটল বয় ও ফ্যাটম্যান নামে দুটি পরমানু বোম্ব ফেলা হয়। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন তৈরি করে রবার্ট ওপেনহাইমারকে এর সদস্য করা হয়। ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নও পরমানু বোম্ব তৈরি করে ফেলে এবং আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ু যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। রবার্ট ওপেনহাইমার হাইড্রোজেন বোম্ব তৈরির বিরোধীতা করেছিলেন কারন এর ধ্বংস ক্ষমতা অনেক বেশী ছিল যার জন্য আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হ্যারি ট্রুম্যান তাকে কমিশন থেকে বার করে দেয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আর্থার ডব্লিউ রাইডারের কাছ থেকে রবার্ট ওপেনহাইমার সংস্কৃত শিখেছিলেন যাতে ভগবত গীতা পড়তে পারেন। ম্যানহাটন প্রজেক্টের বিশেষত্ব ছিল যে এই প্রজেক্টের ১৫ জন বিজ্ঞানীর ১২ জনই ইহুদি ছিলেন। হিটলারের বিরুদ্ধে গোটা বিশ্বে সেসময় ইহুদিরা এক হয়ে গেছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.