ফিচার আর্টিকেল

সিপেক প্রজেক্টে আগ্রহী নয় চীন! তবে কী বন্ধ হতে চলেছে পাকিস্তানের স্বপ্নের প্রজেক্ট!

পাকিস্তান নিজেকে সবসময় চীনের ভালো বন্ধুদেশ দাবী করে। আমেরিকার সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় ভারতের বিরুদ্ধে টিকে থাকার জন্য পাকিস্তানের জন্য এখন চীন ছাড়া কোনও বিকল্পও নেই। শাহবাজ শরীফের চীন সফরেও চীন পাকিস্তানের স্বপ্নের সিপেক প্রজেক্ট নিয়ে আগ্রহী নয় তেমন। কিছু বছর আগেও চীন পাকিস্তানে সিপেক বা চায়না পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর নিয়ে অত্যন্ত উৎসাহিত ছিল কিন্তু বর্তমানে পাকিস্তান এই প্রজেক্ট নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহী থাকলেও চীনের তরফ থেকে ততটা আগ্রহ প্রকাশ করা হচ্ছেনা এই প্রজেক্টে। ২০১৫ সালে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং ৬২ বিলিয়ন ডলারের সিপেক প্রজেক্ট শুরু করে। চীনের বিআরআই বা বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভেরই অংশ এই প্রজেক্ট। 

চীনের কাশগড় থেকে শুরু হয়ে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর বা পিওকের গিলগিট বালতিস্তান হয়ে গোয়াদর বন্দর পর্যন্ত গিয়েছে এই পথ। বিআরআই প্রজেক্টের মাধ্যমে চীন বিশ্বের একশোর অধিক দেশে পরিকাঠামো উন্নয়নে প্রচুর অর্থ খরচ করছে। বিআরআই প্রজেক্টের মাধ্যমে চীন বিশ্ব জুড়ে তাদের বানিজ্যের পরিমান বৃদ্ধি করার মাধ্যমে ভূ-রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করতে চায়। এই বিআরআই প্রজেক্টেরই একটি গুরুত্বপূর্ন অংশ সিপেক প্রজেক্ট। সিপেকের উদ্দেশ্য পাকিস্তানে সড়ক ও রেল নেটওয়ার্ক তৈরি করা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা এবং গোয়াদর বন্দরকে গভীর সমুদ্র বন্দর হিসাবে তৈরি করা। পাকিস্তানের পাশে রয়েছে ইরান যেখান থেকে সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের সাথে যোগাযোগ সম্ভব। চীন সিপেক প্রজেক্টের মাধ্যমে সরাসরি ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল প্রথমে পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরে এনে সেখান থেকে সড়কপথে কাশগড়ে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছিল। এরপর কাশগড়ের পাশে তিব্বতের বিভিন্ন নদীর মাধ্যমে তেল চীনের বড় বড় শহরে পৌঁছে যেত। তাছাড়া সিপেকের মাধ্যমে চীন সরাসরি ভারত মহাসাগরেও প্রবেশাধিকার পেত। ২০২২ সাল পর্যন্ত চীন ২৫.৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে সিপেক প্রজেক্টে। কিন্তু যে গতিতে কাজ হওয়ার কথা ছিল সিপেকে তার থেকে অনেক ধীর গতিতে কাজ হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত এই প্রজেক্টের প্রথম ভাগই সম্পূর্ন হয়নি, তাছাড়া গোয়াদর বন্দরের আশেপাশে বহু অংশেও কাজ পুরো বাকী। 

চীনের এই উচ্চাকাঙ্খী সিপেক প্রজেক্ট মূলত তিনটি কারনে আটকে গেছে দুর্নীতি, রেড ট্যেপ ও নিরাপত্তা। পাকিস্তান এমন একটি দেশ যার প্রতিটি কোনায় দুর্নীতি রয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনীই দুর্নীতির কেন্দ্র যার জন্য এই প্রজেক্টর বহু অর্থ দুর্নীতি হয়েছে। তাছাড়া রেড ট্যেপ অর্থাৎ প্রজেক্টের জন্য বিভিন্ন সরকারি অনুমোদনে ব্যাপক সময় লাগছে। চীন ও পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সমস্যা কাজের সংস্কৃতি দুই দেশে সম্পূর্ন ভিন্ন। চীনের কাছে অর্থের থেকে সময়ের মূল্য অনেক বেশী। চীন কোনও কঠিন পরিকাঠামো নির্মান প্রজেক্টও অত্যন্ত দ্রুতগতিতে করতে সক্ষম কিন্তু সেই তুলনায় পাকিস্তানে একটি প্রজেক্টে অনেক বেশী সময় লাগে। সিপেক প্রজেক্টের আরও একটি বড় সমস্যা নিরাপত্তা। এই প্রজেক্টে জড়িত চাইনিজ ইঞ্জিনিয়ার, শ্রমিকদের উপর বহুবার হামলা হয়েছে পাকিস্তানে, চাইনিজদেট উপর গুলি চালানো হয়েছে, বোম্ব বিস্ফোরন হয়েছে যাতে বহু চাইনিজ নাগরিকের মৃত্যুও হয়েছে। মূলত পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশে গোয়াদর বন্দরের কাছে সিপেক প্রজেক্ট নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। বালুচিস্তান প্রদেশ পাকিস্তানের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লাইফলাইন। এখানকার খনিজ সম্পদ পাকিস্তান সরকার ব্যাপক পরিমানে ব্যবহার করে কিন্তু বালুচ লোকেরা দীর্ঘদিন ধরেই বঞ্চিত। বালুচিস্তানে পাকিস্তানের অনেক বড় বড় সংস্থা ব্যাবসায়িক কেন্দ্র তৈরি করার মাধ্যমে বালুচ লোকেদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কাজ দেবে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে, স্কুল, কলেজ, হসপিটাল তৈরি করবে কিন্তু পাকিস্তান সরকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও বালুচ লোকেদের ঠকিয়েছে। এজন্য সিপেক প্রজেক্টর বিরুদ্ধে ব্যাপক বিদ্রোহ শুরু করেছে বালুচ লোকেরা। বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি বা বিএলএ এখানে চাইনিজ ইঞ্জিনিয়ারদের উপর, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উপর প্রায়ই আক্রমন করে। পাকিস্তান সরকার চীনকে এখানে তাদের নাগরিকদের জন্য পূর্ন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। যার জন্য সিপেক প্রজেক্টে ধীরে ধীরে আগ্রহ হাড়াচ্ছে চীন এবং আগের মতো অর্থ খরচও করতে চাইছেনা চীন। যে কোনও মূল্যে সিপেক প্রজেক্টকে বাঁচাতে পাকিস্তান চীনকে কর ছাড়ের পর্যন্ত সুযোগ দিয়েছে, এটাই পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় মূর্খতা। সাধারনত কোনও বৈদেশিক সংস্থা অন্যকোনও দেশে ব্যবসা করতে গেলে সেইদেশের কোনও সংস্থার সাথে জোট বেঁধে স্থানীয় কর্মীদের মাধ্যমে ব্যবসা করে। কিন্তু পাকিস্তান চীনকে কর ছাড় দেওয়ায় সিপেক প্রজেক্টর জন্য যাবতীয় কাঁচামাল এবং শ্রমিক পর্যন্ত চীন নিজের দেশ থেকে আনছে। ফলে স্থানীয় মানুষজন যেমন কাজ পাচ্ছেনা তেমন পাকিস্তানের সংস্থাগুলোরও কোনও লাভ হচ্ছেনা, উপরন্তু পাকিস্তান সরকারও কর বাবদ কোনও লভ্যাংশ পাচ্ছেনা। সিপেক প্রজেক্টের কারনে পাকিস্তানের উপর ঋনের পরিমানও ক্রমশ বেড়েই চলেছে। পাকিস্তানের উপর বর্তমানে ১২৬ বিলিয়ন ডলারের ঋন রয়েছে যার মধ্যে একা চীনই ৩০ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। সুতরাং আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই সিপেক প্রজেক্ট সম্পূর্ন বন্ধ হয়ে যেতে চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *