ফিচার আর্টিকেল

নিজের কাজে এত টাই মগ্ন থাকতেন যে নিজের কাজ মাঝে মাঝে পেটেন্ট করতেই ভুলে যেতেন

এডিসন এর কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে টেসলা নিউ জার্সিতে রবার্ট লেন আর বিএ ভেল এর লাইটিং ম্যানুফ্যাকচারিং কম্পানি তে জয়েন করেন, এবং এই কোম্পানির দুই মালিকই টেসলা কে কথা দিয়ে ছিলেন যে তাদের লাইটিং প্রজেক্ট এ হেল্প করলে টেসলা এসি ইনডাকশান মোটর এর প্রজেক্ট এও তারা সাহায্য এর হাত বাড়িয়ে দেবে। রবার্ট লেন এর কথা মতই টেসলা লাইটিং ম্যানুফ্যাকচারিং প্রজেক্ট এ হেল্প করেন, অনেক কারখানা আর, আর রাস্তায় লাইটিং এর ব্যাবস্থা করেন, সেই সময়ে টেসলা এর এই কাজ বিজনেস ম্যাগাজিন এও পাবলিস হয়, কিন্তু দুঃখের কথা এখানেও টেসলা কে প্রতারণার শিকার হতে হয়, টেসলা কে কোম্পানি তে নিয়োগ করানোর সময় যে কথা দিয়ে ছিল কোম্পানির দু জন মালিক তা তারা কাজ হয়ে যাবার পর পুরোপুরি অস্বীকার করে। ফলে টেসলা একরকম হতাশ হয়েই এই কোম্পানি ত্যাগ করেন।

তখন টেসলার অর্থনৈতিক অবস্থা এত টাই খারাপ হয়ে যায় যে জীবন চালানোর জন্য মাটিতে গর্ত খোরার কাজ করতে হয় তাকে , যদিও ভিতর ভিতর নিজের এসি কারেন্ট চালিত মোটর নিয়ে আরো গবেষনা করার খিদে চেপে বসে ছিল তার মধ্যে। সামান্য গর্ত খোরার কাজ করতে করতে সেখানকার ফোরম্যান নজরে আসেন টেসলা। টেসলা এর বুদ্ধিমত্তা দেখে খুশি হয়ে সেই ফোর ম্যান তাকে তার কোম্পানির চিপ ইনজিনিয়ার আলফ্রেড ব্রাউন এর কাছে নিয়ে যায়, আলফ্রেড ব্রাউন আগেই টেসলা সমন্ধে বিজনেস ম্যাগাজিন এ পড়েছিলেন তাই টেসলার প্রতিভা নিয়ে তার মধ্যে কোনো সংশয় ছিল না, তাই টেসলা কে তার এসি মোটর তৈরিতে আর্থিক সাহায্য এর জন্য তার এক পরিচিত ব্যাংকার চার্লস পেক এর কাছে পাঠায় এবং এও বলেন” যে টেসলা যদি তার কাজ দিয়ে পেক কে খুশি করতে পারে তাহলে পেক তাকে তার গবেষণার জন্য আর্থিক সাহায্য করবে।

চার্লস পেক এর নজরে আসার জন্য টেসলা একটা কঠিন পরীক্ষা তার সামনে উপস্থাপন করলেন, একটা লোহার ডিম একটা সমতল জায়গায় রেখে তার চারিদিকে এসি সার্কিট লাগিয়ে দিলেন, যখন ওই এসি সার্কিট রোটেটিং ম্যাগনেট ফিল্ড তৈরি করলো তখন ওই লোহার ডিম টা ঘুরতে শুরু করলো এবং কিছুক্ষণ পর পুরো সোজা সুজি ভাবে ঘুরতে শুরু করলো। টেসলা এর এই উদ্ভাবন শক্তি দেখে খুশি হলেন পেক। টেসলার প্রজেক্ট এ সাহায্য এর হাত বাড়িয়ে দিলেন। এর পর তিন জন (টেসলা, ব্রাউন, পেক) মিলে তৈরি করলো এক নতুন কম্পানি যার নাম দেওয়া হল টেসলার নামেই “, টেসলা ইলেকট্রিক কম্পানি “।

পরবর্তি পনেরো বছরে টেসলা অনেক কিছু আবিষ্কার করেছেন , তার মধ্যে সফলভাবে অলটারনেটিভ কারেন্ট এর ব্যাবহার অন্যতম। ১৮৮৮ সালে টেসলা অলটারনেটিভ কারেন্ট নিয়ে একটা বক্তৃতা টেসলা কে বিজ্ঞানী হিসাবে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। টেসলা সেখানে প্রদর্শন করেন কি ভাবে কোন তার ছাড়াই ফ্রিকয়েনসি.বাড়িয়ে দিয়ে ওয়ারলেসলি পাঠানো যায়। ওয়েসটিং হাউস কম্পানি এর এক ইনভেসটার টেসলার চিন্তা শক্তি কে বুঝতে পেরে এগিয়ে আসে, টেসলা কে তার সাথে কাজ করার জন্য পাঁচ হাজার ডলার, কোম্পানির কুড়ি হাজার শেয়ার অফার করে। এরপরে সফল ভাবেই টেসলা আর ওয়েসটিং হাউস এর ইঞ্জিনিয়ার এসি মোটর এর ডেভেলপ করা শুরু করে। টেসলার এসি কারেন্ট এর খ্যাতি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ সেটা ব্যবহার করতে এগিয়ে আসে।

কিন্তু টেসলার এই উন্নতি ইলেকট্রিক বাল্ব এর স্রষ্টা এডিসন এর কপালে ভাঁজ ফেলে। কারণ বাল্ব আবিষ্কার করলেও তা ঘরে ঘরে ব্যবহার করার জন্য দরকার ছিল বিদ্যুৎ এর। তাই নিজের তৈরি পাওয়ার পাওয়ার স্টেশন তৈরি করে ডিসি কারেন্ট দিয়ে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পাঠাতেন। এবং তা দিয়ে অনেক অর্থ রোজগার করতেন। কিন্তু টেসলার এসি কারেন্ট এর বাড় বাড়ন্ত চিন্তার ভাঁজ ফেললো তার কপালে। বুঝতে পারলেন টেসলা কে আটকাতে না পারলে তার ব্যবসা বন্ধ হবে।

তাই বাজারে নিজের আধিপত্য ধরে রাখতেই শুরু করলেন টেসলার বিরুদ্ধে চক্রান্ত।

টেসলার  আবিষ্কার এসি কারেন্ট  মানুষ এর জন্য কতো টা ভয়ংকর সেটা প্রমাণ করার জন্য এক অদ্ভূত পরীক্ষা করলেন, একজন মৃত্যু দন্ড সাজা প্রাপ্ত আসামী কে এসি কারেন্ট যুক্ত একটা চেয়ার এ বসিয়ে তাতে সখ দিয়ে মেরে ফেলেন, সেই খুনি আসামীর মৃত্যু এত ভয়ংকর ছিল যে সেটা দেখে ভয় পেয়ে যায় অনেকে। যদিও এর পরে থেমে থাকেন নি এডিসন। বেশ কিছু কুকুর কে এসি কারেন্ট দিয়ে শক দেন, এবং একটা এলিফ্যানট কে এসি কারেন্ট দিয়ে মেরে ফেলেন,লোক কে বোঝানোর চেষ্টা করেন এসি কারেন্ট আসলে কতোটা ক্ষতি কর। এত কিছুর পরেও টেসলা কিন্তু এসি মোটর তৈরির কাজ সম্পূর্ণ করেন। এরপর ১৮৯০ সালে টেসলা কে আমেরিকান ইনস্টিটিউট অফ ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার এর ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়। 

এসি মোটর তৈরির পর ও টেসলা অসিলেটার তৈরি করেছেন, যার সাহায্যে ফ্রিকয়েনসি পরিবর্তন করা যায়, কনডেনসার, আর ইলেকট্রিক মিটার ও এসেছে টেসলার হাত ধরে। এছাড়া বর্তমান যুগের এক্স রে নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। টেসলা ইলেকট্রিক কে তারের বদলে রেডিও একটিভ এর মাধ্যমে পাঠাতে চেয়ে ছিলেন। এমনকি বিজ্ঞানী ম্যাকরনি যিনি প্রথম রেডিও আবিষ্কার করেছিলেন যার জন্য তাকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল এই রেডিও আইডিয়া ও টেসলার নিজের ছিল। তিনি নিজের কাজে এত টাই মগ্ন থাকতেন যে নিজের কাজ মাঝে মাঝে পেটেন্ট করতেই ভুলে যেতেন তাই তার সব আইডিয়া অনেকেই চুরি করে বিখ্যাত হয়েছে। 

টেসলা ইলেকট্রিক কে তারের বদলে রেডিও একটিভ এর দ্বারা পাঠাতে চেয়ে ছিলেন, তাই হয়তো তিনি রেডিও আবিষ্কার এর উপর এত জোর দেননি, কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, ওয়েসটিং হাউস এর ইনভেসটার রা রেডিও তে টেকনোলজি তে বেশি লাভ দেখতে পায়, তাই টেসলার প্রজেক্ট এ থেকে সমস্ত অর্থ তুলে নিয়ে রেডিও এর টেকনোলজি তে ব্যয় করে। এর ফলে টেসলা আবার নিশ্ব হয়ে অবসাদ এ ডুবে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *