অফবিট

মহাদেব কেন জটায় গঙ্গা, গলায় সাপ, দেহে বাঘের ছাল নিয়ে ঘুরে বেড়ান?

নিউজ ডেস্কঃ ভগবান শিবের রূপ সব দেবতাদের থেকে আলাদা দেখায়। যেমন-জটায় গঙ্গা ধারণ করা, গলায় সাপ এবং দেহে বাঘের ছাল ধারণ করা ইত্যাদি।কিন্তু আপনাদের কি কখন মনে হয়েছে যে মহাদেব কেন এইরকম রূপে থাকেন? আসলে দেবাদিব মহাদেব তাঁর এইরূপ ধারনের মাধ্যমে আসলে আমাদের কাছে  কিছু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। 

মহাদেবের জটা- মহাকাশের দেবতা বলে মহাদেব শিবকে  মনে করা হয়। এছাড়াও যেহেতু শিবের জটা আকাশের সমান তাই মহাদেবকে ব্যোমকেশও বলা হয়ে থাকে। আসলে এই জটা হলে বায়ুর প্রতীক।আর সমস্ত প্রাণীদের শ্বাস নিতে সাহায্য করে এই বায়ু ব্রহ্মাণ্ড।তাই দেবাদিব মহাদেব সব প্রাণীর প্রভু বলায় হয়।

শিবের জটায় পবিত্র গঙ্গা- সনাতন ধর্ম অনুসারে, গঙ্গা নদীকে সবচেয়ে পবিত্র বলে মানা হয়ে থাকে। দেখা যায় যে মহাদেবের জটা থেকে গঙ্গা নদী প্রবাহিত হয়। এই পৃথিবীতে গঙ্গাকে মহাদেব নিয়ে আসার জন্য তাকে জটার ওপর ধারণ করেছিলেন তিনি।আর এই গঙ্গা নদীকে মহাদেবের জটায় ধারণ করা তাৎপর্য হল যে মহাদেবকে আমরা সংহারের প্রতীকী মনে করি কিন্তু তিনি সংহারের প্রতীকী ছাড়াও তিনি এই পৃথিবীলোকে পবিত্রতার জ্ঞান এবং শান্তির প্রতীকও বটে।  

শিবের মাথায় থাকায় চন্দ্রমা- মহাদেবের মাথায় অর্ধচন্দ্র বিরাজমান দেখতে পাওয়া যায়।এই অর্ধচন্দ্র মহাদেবের মনকে শান্ত রাখে এবং যখন মহাদেব বিষপান করেছিলেন তখন মহাদেবের নীল হয়ে যাওয়া শরীরে ঠান্ডা প্রদান করার জন্য মহাদেবের মাথায় বিরাজমান। 

মহাদেবের তৃতীয় নেত্র- আমরা মহাদেবের কপালের সুসজ্জিত তাঁর তৃতীয় নেত্র দেখতে পাই। এবং মহাদেব যখন প্রচন্ড রেগে যান তখন তার তৃতীয় নেত্র খুলে যায় বলে আমরা মনে করি। কিন্তু এই তৃতীয় নেত্রটিকে  জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তাঁর সাথে সাথে এই বিশ্বসংসারের অবুদ্ধি ও অজ্ঞানের সমাপ্তেরও প্রতীক বলা হয়। আধ্যাত্বিক দৃষ্টিতে যদি দেখা যায় তাহলে মহাদেবের এই তৃতীয় নেত্রটি বার্তা দেয় যে ভৌতিক বিষয়ের উপর দৃষ্টিপাতের পরিবর্তে বাস্তব জীবনের উপর দৃষ্টিপাত করার। তাই মহাদেবের এই তৃতীয় নেত্র এটাই বোধ করায় যে সাধারণ ব্যক্তি তার জীবন বাস্তবতার দৃষ্টিতে দেখুক। জীবনকে কেবল এরকম দৃষ্টিতেই কখনোই দেখা উচিত নয় যা কেবল বেঁচে থাকার জন্য অবশ্যক এরকম দৃষ্টিতে দেখা উচিত যা বাস্তবে ঘটছে।

মহাদেবের এই তৃতীয়  নেত্রটি সত্ত্বঃ, রজঃ, তমঃ এই ত্রিগুন যা অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ এই তিনকাল এবং স্বর্গ পৃথিবী পাতাল এই তিন লোকের প্রতীক। আর এই জন্য মহাদেবকে ত্রোয়েম্বকও বলা হয়ে থাকে। ভগবান শিবের এই তৃতীয় নেত্রটি খোলার অর্থ হলো জীবনের উদ্দেশ্যকে বোঝা এবং জীবনকে এক নতুন দৃষ্টি থেকে দেখা।সংসারে প্রত্যেকটি মানুষকে তৃতীয় নেত্র খোলার অর্থাৎ আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক বলে মনে করা হয়।

দেবাদিদেব মহাদেবের কন্ঠে থাকা সাপ- ভগবানের শিবের গলায় জড়িয়ে থাকে সাপে। সাপ এমন একটি প্রাণী যেটি সংহারক প্রবৃত্তির হয়।এবার প্রশ্ন হল যে সাপ যদি কোন মানুষকে ছোবল দেয় তাহলে সেই ব্যক্তি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে তাহলের এরকম একটি ভয়ঙ্কর প্রাণীকে কেন ভগবান শিব তার কণ্ঠে ধারণ করে রাখেন? মহাদেবের কণ্ঠের সাপ ধারন করার তাৎপর্য হল মহাদেব অজ্ঞান এবং অন্ধকারকে তার নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। তাই সাপের মত হিংস্র জীবও ভগবান শিবের অধীনে থাকে।

শিবের বাহন নন্দী- আমার নন্দীকে শিবের বাহন হিসাবে জানি।এই নন্দীকে বলা হয় ধ্যানের প্রতীক। এছাড়াও জীবনের প্রতি সজাগের প্রতীক এবং জীবনের বাস্তবিক লক্ষ্যকে পূরণ করার প্রতীকও বলায় হয় মহাদেবের বাহন নন্দীকে। নন্দী শান্ত প্রকৃতির হয়। ধ্যানে মগ্ন হয়ে থাকা কোন প্রকার অপেক্ষা, মোহো এবং আসক্তি না থাকা এটায় হল নন্দী স্বভাব। তিনি আমাদের এই বার্তা দেন যে প্রত্যেক মানুষকে আসক্তি ত্যাগ করে ধ্যানে করা উচিত এবং ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক করার চেষ্টা করা উচিৎ।

শিবের শরীরে থাকা বাঘের ছাল- ভগবান শিব শরীরে বাঘের ছাল পরিধান করে থাকেন।অনেকে মনে করেন যে এটি  শিব জীবনশৈলীর একটি অঙ্গ।তবে  বাস্তবে বাঘকে এক হিংস্র পশু বলে মানা হয় এবং সেই হিংস্র পশুর চামড়ায় মহাদেব তার শরীরে পরিধান করে থাকেন।তাই সবার মনে প্রশ্ন উঠে যে কেন? আসলে মহাদেবের বাঘের ছাল পরিধান করার অর্থ হল যে মহাদেব তার নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন সমস্ত হিংসাকে।

শিবের  শরীরে মাখা ভস্ম- মহাদেব শরীরে ভস্ম মেখে থাকেন।আর এর অর্থ হল যে মানুষের জীবন যখন শেষ হয়ে যায় তখন অন্তিম সংস্কারের পর পরে থাকে শুধু  ভস্ম আর এই বিশ্বসংসার থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় শরীর।বেদেও এই কথা বলা হয় যে রুদ্রই হল অগ্নির প্রতীক আর সবকিছুই ভস্ম করে দিতে পারে অগ্নি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *