ডিফেন্স

পাকিস্তানের সাথে যৌথভাবে ড্রোন তৈরির চুক্তি সেরে ফেলেছে চীন। বিশ্বের অস্ত্র বাজারে আসছে চীনের সামরিক ড্রোন

নিজস্ব সংবাদদাতা:বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি সম্পন্ন দেশগুলির মধ্যে অন্যতম চিন। নিত্য নতুন সামরিক সরঞ্জামে সেনাবাহিনীকে সজ্জিত করে তুলছে চিন। শোনা যাচ্ছে বিশ্বের ড্রোন বাজারে 2024 সালের মধ্যেই একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপন করার লক্ষ্যে জোরকদমে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে চীন। এখনো পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ড্রোন বিক্রিতে প্রথম স্থানে থাকলেও দ্বিতীয় স্থানে থাকা চীনের সাথে দূরত্ব ক্রমশ কমছে। এই 2021 সালেই বিশ্ব বাজারে পূর্বের থেকে অনেক বেশি পরিমাণে সামরিক ড্রোন নিয়ে প্রবেশ ঘটিয়েছে চীন। চীনের কারখানাগুলি সামরিক ড্রোন তৈরিতে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেছে।  বিশেষজ্ঞদের মতে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার যুদ্ধে যে মিলিটারি ড্রোনগুলি ব্যবহৃত হয়েছিল তার বেশিরভাগই আসলে চীনে তৈরি। 

এরইমধ্যে পাকিস্তানের সাথে যৌথভাবে ড্রোন তৈরির চুক্তি সেরে ফেলেছে চীন।  ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে চীনের সহায়তায় পাকিস্তানের কারখানায় ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়। ওই বছরই আবার চীনের কাছ থেকে পাকিস্তান প্রায় 48 টি ড্রোন ক্রয় করেছিল। সেই সময় ড্রোনগুলির কার্যক্ষমতা দেখে আশ্চর্য হয়ে পাকিস্তান চীনের সাথে যৌথভাবে নিজের দেশেই নতুন করে ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

বর্তমানে গোটা বিশ্ব জুড়েই ড্রোনের চাহিদা আকাশ ছুঁয়েছে। আর সেই জন্যেই বিশ্ব বাজার দখল করতে ড্রোন মার্কেটকে টার্গেট করে কারখানায় জোরকদমে ড্রোন তৈরি আরম্ভ করেছে চীন। আগের বছরে একাধিক দেশকে সামরিক সরবরাহ করেছে চিন। এখানেই না থেমে ২০২৪ সালের মধ্যে বিপুল পরিমাণ সামরিক ড্রোন তৈরি লক্ষ্য রেখে চলছে চিন। আর এই পরিকল্পনার অংশ হিসাবে ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যেই ড্রোন সরবরাহ করার জন্য এজেন্ট নিয়োগ করে ফেলেছে চীন। আন্তর্জাতিক সংবাদ পত্রিকা এশিয়া টাইমস এর রিপোর্ট থেকে জানা গেছে চীন প্রত্যেক বছর তার ক্লায়েন্টদের কাছে বৃহত সামরিক ড্রোনসহ ২০০টি মাঝারি আকারের ড্রোন সরবরাহ করবে বলে ঠিক করেছে। এর মধ্যে প্রথম ড্রোনের ব্যাচটি পরীক্ষা করে চীনের ন্যাশনাল জিওমেটিক্স সেন্টারের সাথে চুক্তির মাধ্যমে ক্রয় করতে ইচ্ছুক এমন দেশগুলির এজেন্সিতে পৌঁছে দেওয়া হয়ে গেছে। যার মধ্যে একটি ড্রোন এর নামকরণ করা হয়েছে রেইনবো সিএইচ-৪। এই গোটা প্রোজেক্টের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে চীনের এরোস্পেস বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি একাডেমি। 

প্রথম বার সিএইচ -৪ উৎপাদনের কাজটি জরুরীভাবে শেষ করা হয়েছিলো চীনের তাইজহু প্লান্টে । সেখানে উৎপাদিত শক্তিশালী এই এক একটি ড্রোনের দাম ধরা হয় গড়ে সাড়ে ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চীনের নতুন এই প্রযুক্তি প্রথমবার সারা বিশ্বের নজর কাড়ে ঝুহাইয়ের ১২ তম চীন আন্তর্জাতিক বিমান চালনা ও মহাকাশ প্রদর্শনীতে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে এই একই রকম ড্রোন তৈরির চেষ্টা চালিয়ে গেলেও সশস্ত্র ড্রোনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় মার্কিন অস্ত্র বিক্রয়ের সমর্থকরা ভীষণভাবে আশাহত হয়। অপরদিকে এই সমস্ত নিষেধাজ্ঞা বিন্দুমাত্র কর্নপাত না করে চীন বিশ্ববাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপন করার চেষ্টা চালানোয় পেয়েছে তার ফল ও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বাণিজ্যে বেশ কিছুটা ভাগ বসিয়েছে চীন। ফলত, এখন আমেরিকা উল্টে পুনরায় ড্রোনের বাজার দখলের চেষ্টায় রয়েছে। 

এই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এসআইপিআরআইয়ের সিনিয়র গবেষক সিমোন ওয়েজম্যান এশিয়া টাইমসকে জানায়, “পশ্চিমী দেশগুলির যেখানে যে কোন যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করার আগে তার সঙ্গে শর্তের একগাদা তালিকা চাপিয়ে দেয় সেখানে চাইনিজরা বিনা ঝঞ্ঝাটে অস্ত্র বিক্রিতে রাজী হয়ে যায়”। অনেকেই মনে করছেন ঠিক এই কারণেই চীন এত দ্রুত বিশ্বের ড্রন বাজার দখল করতে পেরেছে।

সূত্রের খবর চীনে তৈরি এই সিএইচ -৪ স্থল ও জলভাগের যেকোনো উচ্চতা সম্পন্ন মিশনের জন্য একেবারে উপযুক্ত। এর বিশেষত্ব হলো এটি সর্বাধিক ১২ হাজার ৬০০ কেজি ওজনের এবং এর ১১০ কেজি পেডলড এর ক্ষমতা রয়েছে। তাছাড়া দাবি করা হচ্ছে সিএইচ -৪ সিরিজের সহনশীলতা প্রায় ৩০ঘন্টা। ১৮ মিটার ডানা সম্পন্ন  সিএইচ -৪ এর একটি টেক অফের ওজন ১.৩ টন এবং পেডলোড প্রায় ৩৫০ কেজি। জানলে অবাক হবেন আমেরিকান হেলফায়ারের প্রায় সমান ক্ষমতাসম্পন্ন এই চাইনিজ ইউএভি ল্যান জিয়ান লেজার-গাইডেড এয়ার-টু-সারফেস মিসাইল, টিজি ১০০ লেজার,আইএনএস জিপিএস-গাইডেড বোমা এবং এআর -১ / এইচজে -১০ অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল সহ পে-লোড একসাথে বহন করার ক্ষমতা রাখে। গত দু’বছরে চীন তাদের ড্রোনের প্রযুক্তিকে এক অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এখনো অব্দি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ইতালি প্রভৃতি দেশ কেবলমাত্র এমকিউ -৯ রিপারের একটি সশস্ত্র সংস্করণ ব্যবহার করলেও অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো বারংবার সিএইচ -৪এর মতো চীনা ড্রোন তৈরীর চেষ্টাও করেছে।  এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, চীনের ডিজেআই দ্বারা নির্মিত ড্রোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পেন্টাগন এবং বিশেষজ্ঞদের মতে খুব শীঘ্রই সম্ভবত সামরিক ক্ষেত্রেও চীনে নির্মিত ড্রোনের ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা চাপতে পারে।  

তবে,সিএনবিসি এর মতে এই চিনা প্রযুক্তি যথেষ্ট উন্নত তার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিশেষ আমল না দিয়ে যেকোনো ক্রেতার কাছে চীন তাদের ড্রন বিক্রি করতে সক্ষম। বাজারে একেবারেই কম দামে বিক্রি করতে রাজি হওয়ায় চীনের এই ড্রোন বিক্রয় সম্পূর্ণভাবে রোধ করাও বেশ কষ্টসাধ্য হবে।  লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের ভূমি যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ জ্যাক ওয়াটলিংয়ের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ড্রোন এর চাহিদা বিপুল হলেও তারা সংযুক্ত আরব আমিরশাহীকে সশস্ত্র ইউএভি বিক্রি করতে অস্বীকার করায় সেখানে উল্টে চিনা ড্রোন ক্রয় আরম্ভ হয়ে গেছে। এছাড়া উপসাগরীয় সামরিক বাহিনীর কাছে আমেরিকান ড্রোন থাকলেও সেগুলো লক্ষ্যবস্ত ধ্বংস করতে তেমন সক্ষম নয়। অপর দিকে চীনের সামরিক ড্রোন এক্ষেত্রে বেশ কার্যকরী। ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রগুলোর মত চীনের হাত ধরে আগামী বিশ্বে অস্ত্র বাণিজ্য হয়তো আসতে চলেছে বেশ কিছু নতুনত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *