হিটলারের বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে ভারতীয় পাইলটরা পর্যন্ত যুদ্ধ করেছিল। জানুন বিস্তারিত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে মূলত চারটি সুপার পাওয়ার ছিল ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার তিন বছরের মধ্যে ব্রিটেন বাদে বাকী ইউরোপ জার্মানি দখল করে নেয়। যে ফ্রান্স প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানিকে পরাজিত করে চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল, সেই ফ্রান্সকে অসাধারন সামরিক নীতিতে ত্রিমুখী আক্রমনের মাধ্যমে মাত্র ছয় মাসে দখল করে নেয় জার্মানি। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সেসময় জার্মানির চুক্তি ছিল একে অপরের উপর আক্রমন না করার। ইউরোপের আরেক শক্তিশালী দেশ ইটালি ছিল জার্মানির বন্ধু। ফলে ব্রিটেন বাদে প্রায় গোটা ইউরোপই হিটলারের অধীনে চলে যায়। তবে ব্রিটেনের অবস্থাও খারাপ ছিল, নরওয়ে ও ফ্রান্সে ব্রিটিশ সেনা জার্মান নাজি সেনার কাছে পরাজিত হয়ে ব্রিটেনে পালিয়ে আসে। ইউরোপে একা হয়ে যাওয়া ব্রিটেনের কাছে সেসময় নিজেকে রক্ষা করা ছাড়া কোন উপায় ছিলনা। এদিকে হিটলার ও চাইছিল ব্রিটেনকে পরাজিত করে তাদের দর্প চূর্ন করতে, যার কারনে ব্রিটেনের যুদ্ধ হয় উভয় পক্ষের মধ্যে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন এই যুদ্ধে হিটলারের অপরাজেয় বায়ুসেনার ব্যাপক পরাজয় ঘটেছিল।
২২ জুন, ১৯৪০ সালে ফ্রান্স জার্মানির সাথে চুক্তি করতে বাধ্য হয় এবং জার্মানির প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বদলা সম্পন্ন হয়। ১৯৪০ সালের দিকে জার্মানি যত ইউরোপীয়ান দেশ দখল করেছিল যেমন পোল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া সব দেশ গুলোই জার্মানির সাথে স্থলপথে যুক্ত ছিল। হিটলারের আক্রমনের পদ্ধতি ছিল প্রথমে জার্মান বায়ুসেনা বোম্বিং করতো কোন দেশের বড় বড় শহরে, তারপর ট্যাঙ্ক বাহিনী ও সেনা যেত। ফলে বিশাল জার্মান সেনার সামনে কেউ প্রতিরোধ করতে পারতনা৷ কিন্তু ব্রিটেনের একটি সুবিধা ছিল তা হচ্ছে ব্রিটেন ইউরোপের মূল ভূভাগ থেকে ইংলিশ চ্যানেলের মাধ্যমে আলাদা একটি দ্বীপ রাষ্ট্র, যার কারনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এমনকী বিগত হাজার বছরের ইতিহাসে ব্রিটেনে কোন দেশ তেমন ভাবে আক্রমন করতে পারেনি। ব্রিটেনের নৌবাহিনী বরাবরই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী গুলোর মধ্যে একটি ছিল। যার কারনে হিটলারও সরাসরি ব্রিটেনে আক্রমন করতে চাইছিল না। হিটলার ভেবেছিল ইউরোপে ব্রিটেনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশ ফ্রান্সকে পরাজিত করলেই ব্রিটেন জার্মানির সাথে শান্তিচুক্তি করবে। কিন্তু ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল জার্মানির সাথে কোনওরকম চুক্তিতে রাজি ছিলনা। উইনস্টন চার্চিল যুদ্ধ করতে রাজি ছিল বাধ্য হয়ে হিটলার ব্রিটেনে আক্রমনের জন্য একটি বিশেষ পরিকল্পনা তৈরি করে, যার নাম দেওয়া হয় অপারেশন সীলায়ন।
হিটলারের পরিকল্পনা ছিল ফ্রান্সের বন্দর থেকে জাহাজে করে নাজি সেনা ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ব্রিটেনের বন্দর গুলোতে যাবে। তবে এই পরিকল্পনায় প্রধান সমস্যা ছিল ব্রিটিশ রয়েল নেভি৷ ব্রিটেনের শক্তিশালী নৌবাহিনী পুরো ইংলিশ চ্যানেল অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। যার জন্য হিটলার প্রথমে জার্মান বায়ুসেনার সাহায্যে ইংল্যান্ডের বন্দরগুলোতে আক্রমনের পরিকল্পনা করে। সেসময় জার্মান বায়ুসেনাতে এইচই ১১১, জেইউ ৮৮ এর মতো বোমারু বিমান এবং বিএফ ১০৯, বিএফ ১১০ এর মতোন শক্তিশালী যুদ্ধবিমান ছিল। জার্মান বায়ুসেনাতে সেসময় ২৫০০+ যুদ্ধবিমান ছিল, যেখানে ব্রিটেনের কাছে ১৯০০ এর মতোন যুদ্ধবিমান ছিল। ব্রিটেনের কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল জার্মান বায়ুসেনার পাইলটরা অত্যন্ত অভিজ্ঞ ছিল।
নরওয়ে, স্পেন, বেলজিয়াম, পোল্যান্ডের যুদ্ধে জার্মান বায়ুসেনা অত্যন্ত দক্ষতা প্রদর্শন করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ব্রিটেন নিজেকে সামরিক ভাবে শক্তিশালী করতে খুব কম ব্যয় করছিল। ১৯৩৫-৩৬ সাল থেকে হিটলারের আগ্রাসন দেখার পর থেকে ব্রিটেন সামরিক খাতে ব্যায় শুরু করে, যার কারনে ব্রিটেনের কাছে যুদ্ধবিমান জার্মানির অপেক্ষা কম ছিল। ব্রিটেনের কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি যুদ্ধবিমান ছিল সুপারমেরিন স্পিটফায়ার এবং হকার হ্যারিকেন। জার্মানির বায়ুসেনা ব্রিটেনে আক্রমনকে দুভাগে বিভক্ত করে। প্রথমে তাদের পরিকল্পনা ছিল ব্রিটেনের বানিজ্যিক জাহাজ, শিল্পাঞ্চল, গুরুত্বপূর্ন জায়গা ও বন্দরে বোম্বিং করা, এরপরেও যদি ব্রিটেন শান্তিচুক্তিতে সই না,করে তারপর সাধারন মানুষের উপর আক্রমন করা হবে। হিটলার নিশ্চিত ছিল মাত্র চার সপ্তাহে ব্রিটেন পরাজিত হবে। জার্মানি জানত তাদের যুদ্ধবিমানের সংখ্যা অনেক বেশী তাই তারা জিতবেই। ১০ জুলাই, ১৯৪০ সালে জার্মান বায়ুসেনা আক্রমন শুরু করে। জার্মান বোম্বার গুলোকে চারদিক দিয়ে কভার দিয়ে নিয়ে যায় যুদ্ধবিমান গুলি। ফলে ব্রিটিশ বায়ুসেনার উপর চাপ বাড়তে থাকে। রয়েল এয়ারফোর্সকে জার্মান বোম্বার গুলোকে বোম্বিং এর আগেই ধ্বংস করা দরকার হয়ে পড়ে কিন্তু তার আগে তাদের জার্মান যুদ্ধবিমান গুলির সাথে লড়াই করতে হচ্ছিল। জার্মান বায়ুসেনা একমাস ধরে ইংলিশ চ্যানেলের দক্ষিন ভাগে আক্রমন করে কিন্তু ব্রিটিশ বায়ুসেনাও সমানে প্রতিরোধ চালিয়ে যায়। এরপর ১৩ আগস্ট জার্মানি তাদের পরিকল্পনা বদলে ব্রিটিশ বায়ুসেনার হাইকম্যান্ডে আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৪ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত জার্মানি এত আক্রমন শুরু করে যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল পর্যন্ত চিন্তায় পড়ে যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ রয়েল এয়ারফোর্স চারটি ভাগে বিভক্ত ছিল গ্রুপ ১০, গ্রুপ ১১, গ্রুপ ১২ এবং গ্রুপ ১৩. গ্রুপ ১১ এর সাথেই জার্মান বায়ুসেনার সবচেয়ে বেশী লড়াই হয়। ১৮ আগস্ট, ১৯৪০ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী আকাশ যুদ্ধ হয় জার্মানি ও ব্রিটেনের মধ্যে। তবে এরমধ্যেই একটি এমন ঘটনা ঘটে যায় যার কারনে এই যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। দুটি জার্মান বিমান পথ হারিয়ে লন্ডনে পৌঁছে যায় এবং সেখানে বোম্বিং করে। যার প্রতিশোধ নিতে ব্রিটিশ বায়ুসেনা বার্লিনে বোম্বিং করে। এরপর হিটলার জার্মান বায়ুসেনাকে ব্রিটিশ হাইকম্যান্ডের বদলে ইংল্যান্ডের শহর গুলোতে বোম্বিং এর আদেশ দেয়। বলা হয় এটাই হিটলারের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। জার্মান বায়ুসেনা যে হারে আক্রমন করছিল ব্রিটিশ হাইকাম্যান্ডের উপর তাতে আর কিছুদিনের মধ্যেই তারা ভেঙে পড়ত। হিটলারের এই একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বদলে দেয়। এরপর জার্মান বায়ুসেনা ব্রিটেনের শহর গুলো বিশেষ করে লন্ডনে আক্রমন শুরু করে। কিন্তু লন্ডনে আক্রমন তেমন সফল হচ্ছিলনা কারন লন্ডনকে রক্ষা করার জন্য ব্রিটেনের বিশেষ ডিফেন্স নেটওয়ার্ক ছিল। যেখানে বিশেষ জায়গায় থাকা রেডার ও যুদ্ধবিমানের সমন্বয় লন্ডনকে রক্ষা করছিলো। ব্রিটেনের রেডার এতটা শক্তিশালি ছিল যে জার্মান বায়ুসেনা যখনই ইংলিশ চ্যানেলে আসত তখন ব্রিটিশরা জেনে যেত কতগুলো জার্মান বিমান আসছে, সেই মতো ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান প্রতিরোধ করতো।
সেপ্টেম্বর ১০ -১৫ অবধি জার্মানি সবচেয়ে বেশী আক্রমন করে ব্রিটেনে, এমনকী লন্ডনে টানা ৫৭ দিন ধরে আক্রমন করে জার্মান বায়ুসেনা তাও তেমন কোন আক্রমন সফল হয়নি। এদিকে হিটলারও ক্রমশ বিরক্ত হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে জার্মান বায়ুসেনার মোনোবল ভেঙে পড়ে এবং অক্টোবর মাসের শেষ দিকে পুরোপুরি আক্রমন বন্ধ করে দেয় জার্মান বায়ুসেনা।
ব্যাটেল অফ ব্রিটেন ইংল্যান্ডের জন্য একটি বড় বিজয় ছিল যদি এই যুদ্ধে ইংল্যান্ড হেরে যেত তাহলে জার্মানি অপারেশন সী লায়ন শুরু করতো এবং ফ্রান্স থেকে জার্মান সেনা ইংল্যান্ডে আসতো। ব্যাটেল অফ ব্রিটেনে রয়েল এয়ারফোর্সের পাইলটরা যে দক্ষতা দেখিয়েছিল তার প্রশংসা স্বয়ং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল পর্যন্ত করেছিল। ব্রিটেনের রয়েল এয়ারফোর্সে শুধু ব্রিটেনের নয় ভারত, পোল্যান্ড, চেকশ্লোভিয়া, অস্ট্রেলিয়া সহ অনেক দেশের পাইলটই ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সবচেয়ে বেশী জার্মান যুদ্ধবিমান ধ্বংসের কৃতিত্ব রয়েছে ব্রিটিশ রয়েল এয়ারফোর্সের ৩০৩ নম্বর স্কোয়াড্রনের, এই স্কোয়াড্রনের সমস্ত পাইলটই ছিল পোল্যান্ডের। জেমস হল্যান্ডের দি ব্যাটেল অফ ব্রিটেন বইয়ে এই যুদ্ধের ব্যাপারে পুরো বিস্তারিত লেখা রয়েছে।
ব্যাটেল অফ ব্রিটেনে জার্মানির পরাজয়ের আরও একটি বড় কারন ছিল জার্মান বায়ুসেনায় সেসময় সবচেয়ে শক্তিশালী যুদ্ধবিমান ছিল বিএফ ১০৯ কিন্তু এই বিমানের একটি সমস্যা ছিল এটি লং রেঞ্জের ছিলনা, ফলে ফ্রান্সের রানওয়ে থেকে ওড়ার পর ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ব্রিটেনে মাত্র দশ মিনিট আক্রমন করে বিমানগুলোকে ফিরে আসতে হত, না হলে জ্বলানি শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ব্রিটেন তাদের সীমানায় লড়াই করছিল ফলে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান অনেকক্ষন আকাশ যুদ্ধ করতো। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির তুলনায় ব্রিটেন দ্রুত গতিতে বিমান তৈরি ও রক্ষনাবেক্ষন করছিল। কোন ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্রিটেন দ্রুত সেগুলো ঠিক করছিলো। অন্যদিকে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত জার্মান বিমানগুলো হয় ইংলিশ চ্যানেল না হয় ব্রিটেনের মাটিতে পড়ে ধ্বংস হচ্ছিল সেগুলো ফিরিয়ে নেবার কোন উপায় ছিলনা, যার কারনে একটা সময় পর জার্মানির যুদ্ধবিমান কমতে শুরু করে।
