বড় হতে না চাওয়ার একটি রোগ। পুরুষরা আক্রান্ত হয় বেশী- তৃতীয় খণ্ড
বড় হতে না চাওয়ার একটি রোগ। পুরুষরা আক্রান্ত হয় বেশী- দ্বিতীয় খণ্ড
ঘরের কাজে উদাসীনতা
শুধু যে পিটার প্যানরা কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব পালন করার ব্যাপারে উদাসীন থাকে তা কিন্তু নয়, নিজগৃহের কাজ করতেও উদাসীনতা দেখায় তারা। যেমন বাজার করা, বিদ্যুৎ বা জলে বিল দেওয়া, ঘর মোছা, খাবার তৈরি করা ইত্যাদি ধরনের নিত্য প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করা থেকেই নিজেদেরকে পিছিয়ে রাখে পিটার প্যানরা। তারা মনে করে যে তার কাজগুলো তার সঙ্গী বা পরিবারের অন্যরাই করে দেবে।
সম্পর্ক তৈরিতে অনীহা
সম্পর্ক তৈরি করা মানেই নানা ধরনের দায়িত্ব ও অঙ্গীকারের সাথে যুক্ত হওয়া। আর এই বিষয়গুলিকে পিটার প্যানরা খুবই ভয় পায়। তারা মনে করে কারও সাথে সম্পর্ক তৈরি করা বাড়তি ঝামেলা। এই সমস্ত জটিলতার মধ্যে ঢোকার থেকে নিজের মতো করে জীবন কাটিয়ে দেওয়াকেই ভালো বলে মনে করে তারা। যার কারণে তারা সহজে রোমান্টিক সম্পর্ক কারো সাথে করতে পারে না। আবার যদিও কেউ রোমান্টিক সম্পর্কে থাকে সেই ব্যক্তি সেটিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে অর্থাৎ বিয়ে করতে চায় না। আবার যদি বিয়েও হয়ে যায় তারপরে অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়ার ভয়ে অনেকে আবার সন্তান নিতে চায় না।
স্মৃতিকাতরতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়
সাধারণত স্বাভাবিক মানুষেরা সামনের দিকে এগিয়ে চলে। তবে এই বিষয়ে পিটার প্যানদের মধ্যে ব্যতিক্রম দেখা যায়। এরা বর্তমানকে উপভোগ করে না, ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তা করতে ভয় পায় এবং অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করতে, তারা অতীতে কতটা সুখী ছিল সেই সমস্ত বিষয়ে ভাবতে বেশি পছন্দ করে। আর এইরকম চিন্তাধারার তাদের মধ্যে তৈরি হওয়ার পেছনে কারণগুলির মধ্যে একটি হল তারা শৈশব বা কৈসরে নিজেদের ইচ্ছেমতো চলত। তাদের কোন দায়িত্ব পালনের চিন্তা করতে হয়নি। তাই তাদের কাছে জীবনের এই সময়গুলি উপভোগ্য ছিল। তবে বর্তমানে নানা দায়িত্ব তাদেরকে পালন করতে হয়, এবং ভবিষ্যতেও সেটি করে যেতে হবে, এই চিন্তাগুলোই জীবন বিরত করে তোলে তাদেরকে।
মাদকাসক্তি
এই রোগের আক্রান্ত ব্যক্তিরা যে কোনো দায়িত্ব পালন না করে সুখে থাকে না কিন্তু নয়। উল্টে তারা এই কারণে সবসময় নিজেদের কাছেই নিজেরা ছোট হয়ে থাকে এবং বাস্তবতার কথা চিন্তা করে উদ্বিগ্নও হয়। আর এই উদ্বেগ থেকে বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় তারা ভুগতে শুরু করে। এছাড়াও বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বাঁচার প্রবণতা তাদের মধ্যে তো রয়েছেই। ক্ষণিকের মানসিক শান্তির জন্য এবং বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বাঁচার উদ্দেশ্যে তারা আশ্রয় হিসাবে মাদককে বেছে নেয়। এরপর এমন এক পর্যায়ে তারা পৌঁছে যায় যে তাদের মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণের বাইরে বেরিয়ে যায়। যার ফলে যেটুকু যা সম্ভাবনা তাদের জীবনের অবশিষ্ট ছিল, সেগুলোরও শেষ হয়ে যায়।
অন্যদের দায়ী করা
পিটার প্যানরা যে শুধুমাত্র জাগতিক সকল দায়িত্ব গ্রহণ করা থেকে দূরে থাকে সেটি কিন্তু নয় তারা নিজেদের জীবনের ব্যর্থতার দায়ভার গ্রহণ করা থেকেও দূরে থাকে। তারা আসলে ওই দায়ও অন্য কারো উপর চাপিয়ে দিতে চায়। তাদের এই জীবনে বড় কিছু না করতে পারা, পদে পদে সমস্যার সম্মুখীন হওয়া এই সমস্ত কিছুর জন্য দায়ী করে তারা তাদের আশেপাশের সবাইকে। তাদের এই দায়ী করার তালিকায় বাবা-মা, ভাই-বোন, শিক্ষক, বন্ধুবান্ধব, প্রেমিক-প্রেমিকা, জীবনসঙ্গী, সন্তান, অফিসের বস — কেউই বাদ পড়ে না। তারা সবাইকেই তারা নিজেদের শত্রু বলে মনে করেন এবং নিজেদেরকে কিছুটা সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এই শত্রুদের কারণেই তারা জীবনে কিছু করতে পারেনি, এমন চিন্তাভাবনা নিজেদের মনের মধ্যে পোষণ করে থাকে।
কারা পিটার প্যান নয়?
মানুষের মধ্যে একটি সহজাত প্রবৃত্তি হল যেকোনো উদাহরণের সাথে নিজেদের মিল খুঁজে পাওয়া। ঠিক সেই প্রবৃত্তির থেকেই এই পিটার প্যান সিনড্রোমের উপসর্গগুলো সম্পর্কে জানার পরও অনেকের হয়তো মনে হচ্ছে যে, “ এই উদাহরণগুলো তো আমার সাথে মিলে যায়। তাহলে কি আমিও একজন পিটার প্যান?”
এই ধরনের ভাবনা যারা পোষণ করছেন তাদের এটা জেনে স্বস্তিবোধ হবে যে এই দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি কিংবা সারাজীবন ছোট থাকার ইচ্ছা থাকা মানেই সেই ব্যাক্তি পিটার প্যান তা কিন্তু নয় কারণ এই বৈশিষ্ট্যগুলি শুধু পিটার প্যানদের একক মালিকানাধীন বৈশিষ্ট্য নয়। এই বৈশিষ্ট্যগুলো কমবেশি সব মানুষের মধ্যেই দেখা যায়। তাই আপনি যদি এই বৈশিষ্ট্যগুলো নিজের মধ্যে খুঁজে পান তাহলে এমনটি মনে করবেন যে আপনিও একজন পিটার প্যান তার কিন্তু কোনো কারণ নেই।
এবার প্রশ্ন হল যে আপনি তাহলে কি করে বুঝবেন যে আপনি পিটার প্যান নয়? এটা বোঝা খুব কঠিন কাজ নয় কারণ হয়তো দায়িত্ব পালনে শুরুতে আপনি অস্বীকৃতি জানান, যেমনটি আরো অনেকেই করে থাকে। তবে শেষ অবধি কি আপনি দায়িত্বটি পালন না করে থাকেন? যদি উত্তরটি না হয় তাহলে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে আপনি পিটার প্যান নন। আবার খারাপ সময়ে বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বাঁচার কথা মনে হলেও, পরে নিজের মনকে মানিয়ে নিতে পারেন তো? বাস্তবতার সাথে মোকাবেলা না করে পালিয়ে যান? যদি যদি উত্তরটি না হয় তাহলে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে আপনি পিটার প্যান নন। আবার চিরকাল ছোট থাকতে চাওয়া, বড় না হতে চাওয়া, অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করা? এইসমস্ত বৈশিষ্ট্যগুলি মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির মধ্যে পড়ে। তবে তার মানে তো এটা নয় যে আপনি এই মানসিকতা জন্য বর্তমানকে উপভোগ করছেন না, ভবিষ্যতের ব্যাপারে সচেতন নন, সর্বোপরি বাস্তবতাকে স্বীকার করার সৎ সাহস রাখেন না, অর্থাৎ এই সমস্ত কাজ যখন এড়িয়ে যাচ্ছেন না তাহলে আপনি বুঝবেন যে আপনি একজন পিটার প্যান নন।
পিটার প্যান সিনড্রোমের কারণ কী?
একজন মানুষ ঠিক কী কী কারণে একজন পিটার প্যান হয়ে ওঠে? এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট কোনো কার্যকারণ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয় নি। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা বেশ কিছু কারণকে এই ধরনের সিনড্রোমের সৃষ্টি হওয়ার জন্য দায়ী করে থাকেন।
প্রথমত, যেসমস্ত বাবা- মা ছোটবেলা থেকে তাদের সন্তানকে অতিরিক্ত শাসনে বা আদরে রাখে, কোনো কিছু করতে দেয় না সেই সমস্ত শিশু ক্রমশ পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যার ফলে তাদের মধ্যে সবসময় নিজেদের কাজগুলো অন্যরাই করে দেবে এমন চিন্তাধারার বিকাশ ঘটে। এরফলে তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও আত্মনির্ভরশীল ও স্বাবলম্বী হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, ছোটবেলা থেকে যেসমস্ত শিশুরা একা একা সময় কাটে, কোনো সমবয়সী বন্ধুবান্ধব থাকে না সেইসমস্ত শিশুরা নিজেদের তৈরি করা এক কাল্পনিক জগতে বিচরণ করে। যার ফলে বড় হওয়ার পরও সেই কল্পনার জগত থেকে বাস্তব জগতে তাদের পক্ষে ফিরে আসা সম্ভব হয় না।
তৃতীয়ত, ছোটবেলায় যদি খুব বাজে কোনো অভিজ্ঞতার সম্মুখীন কোনো শিশু হয় যেমন বাবা-মায়ের মধ্যে অশান্তি চলে বা তাদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়, অথবা শিশুটি (ছেলে কিংবা মেয়ে) যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, এক ধরনের ট্রমার মধ্য দিয়ে সে যায়। যার ফলে তার মনে মধ্যে বাসা বাঁধে নানা ধরনের অসুখের। আর এই সমস্ত থেকে বাঁচার জন্য তখন সে এক ধরনের বিকল্প জগৎ নিজের মনের মধ্যে তৈরি করে নেয়, যেই জগতে সুখী হিসাবে সে নিজেকে কল্পনা করে। অন্যদিকে তার মনের মধ্যে বাস্তব দুনিয়ার প্রতি জন্ম নেয় গভীর ঘৃণা বা ভীতি। এই কারণে সে বাস্তব দুনিয়ার কারো সাথেই ভালো করে মিশতে পারে না, সহজভাবে কোনো কাজ করতে পারে না, কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য যে সাহস জোগাতে পারে না নিজেদের মধ্যে।
আপনার করণীয় কী?
পিটার প্যান সিনড্রোমের সম্পর্কে মনোযোগ সহকারে পরার পর অনেকে হয়তো নিজেকে এখন পিটার প্যান ভাবতে শুরু করেছেন। অথবা আপনা পরিচিতদের মধ্যে কাউকে আপনার মনে হতে পারে যে সে একজন পিটার প্যান। এছাড়াও কি কি কারনে একটি মানুষ পিটার প্যানে পরিণত হয় সেই কারনগুলি জানার পর আপনার পরিচিত কোনো শিশুর কথাও মনে হতে পারে, যে ভবিষ্যতে হয়তো তার পিটার প্যানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে আপনার যদি কোন পরিচিত মানুষ বা নিজেকে পিটার প্যান বলে মনে হয় তাহলে শীঘ্র আপনার কোনো মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিৎ হবে । তবে যদি কোন ব্যক্তি পিটার প্যান হয় সেক্ষেত্রে সেই দোষ কেবল তারই সেটা কিন্তু নয়, একটি সুস্থ জীবন লাভের অধিকার তারও আছে। আর তাকে একটি সুস্থ জীবন লাভে সাহায্য করতে পারেন মনোচিকিৎসকেরা।
আবার আপনার পরিচিত কোনো শিশু অস্বাভাবিক আচরণ করছে এমনটি যদি আপনার মনে হয় সেক্ষেত্রে তার এই আচরণের পিছনে কারনটা জানার চেষ্টা করুন। যদি সম্ভব হয় ঘনিষ্ঠ হোন তার সাথে, বিশ্বাস অর্জন করুন তার। বিশ্বাসযোগ্য এবং সহানুভূতিশীল কারোর সান্নিধ্য পেলে হয়ত সে তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে। আর যদি দেখেন যে ওই শিশুটির অস্বাভাবিকত্বের পেছনে তার বাবা-মা বা অভিভাবকের দায়ী তাহলে তাদেরকে এই বিষয়ে সতর্ক করুন। সর্বোপরি যদি শিশুটির অবস্থা খুব খারাপ হয়, সেক্ষেত্রে শীঘ্র উচিৎ তাকে একজন মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন করা ।
