সমগ্র মঙ্গোলীয় জাতিকে একত্রিভূত করতে এক বিশেষ হাত ছিল চেঙ্গিস খানের

নিউজ ডেস্ক –  পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন রকমের রাজা নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। তাদের মধ্যে যেমন ছিল ভাল তেমন ছিল খারাপও। কিছু রাজার নিজেদের সহৃদয়ের জন্য বহু প্রজাদের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন এবং কিছু রাজা রয়েছে যারা নৃশংসতার জন্য সকলের স্মৃতিতে রয়েছে। এমন একটি নৃশংস রাজার উদাহরণ খুব সহজেই মনে পড়ে সেটি হল হিটলার। এডলফ হিটলার ছিল সবচেয়ে নৃশংস রাজা। কিন্তু তাদের মধ্যে এবার সকল সীমা ছাড়িয়ে সব শিকল ভেঙ্গে নৃসংসতা উচ্চ শিখরে পৌঁছে ছিল যে রাজা তিনি হলেন চেঙ্গিস খান। কারোর কাছে তিনি মহানায়ক তো কারোর কাছে তিনি ভিলেন। তবে এমন এক জনপ্রিয় নেতার তথা রাজার সমাধি স্থল নিয়ে রয়েছে বড়ই রহস্য।  কমবেশি সকলের জানলেও আর একবার এমন নৃশংস মহানায়কের অল্প কিছু পরিচয় দেওয়া একান্তই প্রয়োজন। কারণ চেঙ্গিস খান সম্পর্কে না জানলে তার সমাধিস্থল সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যাবে না। 

মঙ্গোলিয় জাতির জনক হিসেবে পরিচিত ছিল চেঙ্গিস খান। সমগ্র মঙ্গোলীয় জাতিকে একত্রিভূত করতে এক বিশেষ হাত ছিল তার। তবে ইতিহাসের সর্বাধিনায়ক থাকা সত্ত্বেও তার বড়ই কুখ্যাতি ছিল। ইতিহাসের পাতা উল্টালে জানা যায়  চেঙ্গিস খান ওরফে তেমুজিন জন্মগ্রহণ করেছিলেন মঙ্গোলিয়ার ওনান নদীর তীরবর্তী বোরজিগিন বংশে আনুমানিক ১১৫০ থেকে ১১৬০ সনের মধ্যে, অর্থাৎ ১১৬২ সালে। ‌ তবে জন্মগ্রহণ করার সময় তার হাতের মুঠোর মধ্যে ছিল রক্ত। যেটি ওই বংশে মানা হতো যে সকল শিশু হাতের মুঠোয় রক্ত নিয়ে জন্মগ্রহণ করবে তারা ভবিষ্যতে বংশ সামলাবে তথা রাজা উপাধি পাবে। যদিও পরে সেই কথা সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল তেমুজিন। পরে নিজের বীরত্বের জন্য ১২০৬ সালে মঙ্গোলিয়া থেকে উপাধি পান চেঙ্গিস খান।  

শৈশব থেকেই বীরত্বের ক্ষেত্রে পারদর্শী ছিলেন চেঙ্গিস খান। জানা যায় মাত্র ছয় বছর বয়সে বাল্যকালে ঘোড়া চালানোর পাশাপাশি শিকারের অভিযানে বেরোতেন। তবে শৈশবের প্রাক্কালে সব ঠিক থাকলেও মাত্র নয় বছর বয়সে শত্রুদের বিষ প্রয়োগের দ্বারা মৃত্যু হয় তাঁর পিতার। এরপরই সমাজের কঠোর সত্যের মুখোমুখি হয়েছিল শিশু চেঙ্গিস খান। পুরো পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়েছিল।  তবে এই অল্প বয়সে নিজের পরিবারের হাল ধরতে শেখাটাই ছিল চেঙ্গিস খানের কাছে এক অমূল্য ধন। সেই সময় থেকেই মায়ের যুক্তি পরামর্শ নিয়ে সেই যে পরিবারের হাল ধরল এরপরই মঙ্গোলিয়া গোষ্ঠীদের একত্রিত করতে সার্থক হয়েছিল ১২০৬-১৩৬৮ সালে। এরপর থেকে এক এক করে নিজের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী তৈরি করেছিলেন চেঙ্গিস। পরবর্তীতে এই গোটা বিশ্বে বৃহত্তম রাজ্য অধিপত্য বিস্তার করতে সফল হয়েছিলেন তিনি। 

তবে শুধুমাত্র একজন ভালো অধিনায়ক হিসেবেই নয় অন্যদের কাছে চেঙ্গিস খান ছিলেন অতি নির্মম ও  রক্তপিপাসু বিজেতা। চেঙ্গিস খানের হাত ধরে অনেক উন্নত প্রযুক্তি এসেছে মঙ্গোলিয়ায়। মঙ্গলিয়া বাসীদের কাছে তিনি একজন ভগবানের দূতের  থেকে কম কিছু নয়। তার কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখলে দেখা যায় ‌ তিনি তার আধিপত্যের রাজা হওয়ার আগে পূর্ব মধ্য এশিয়ার অনেকগুলি যাযাবর জাতিগোষ্ঠীকে একটি সাধারণ সামাজিক পরিচয়ের অধীনস্থ করেছিলেন। মঙ্গলিয়া জাতির পত্তন ঘটানোর পর ৪০-৫০ বছর বয়স সময় তিনি বের হন বিশ্বজয়ে। প্রথমে পরাজিত করেন জিন রাজবংশকে এরপর একে একে চীন, পশ্চিম জিয়া, উত্তর চীনের জিন’ রাজবংশ, পারস্যের খোয়ারিজমীয় সাম্রাজ্যঃ এবং ইউরেশিয়ার কিছু অংশ, গণচীন, রাশিয়া, মঙ্গোলিয়া, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া, ইরাক, ইরান, তুরস্ক, কাজাখস্তান, কিরগিজিস্তান, উজবেকিস্তান, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান, তুর্কেমেনিস্তান, মালদোভা, দক্ষিণ কোরিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং কুয়েতের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন চিঙ্গিস খান। তবে শুধুমাত্র চেঙ্গিস খান নয় তার মারা যাওয়ার পর তার পুত্র মঙ্গলিয়ায় আধার বজায় রেখেছিলেন প্রায় ১৫০ বছর ধরে। চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পর তার বীরত্বের কথা স্মরণ করেন মঙ্গলিয়াবাসীরা। তবে অন্যান্য জায়গায় অর্থাৎ যে সকল রাজ্যের তিনি আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন তার নির্মমতার জন্য তাঁকে স্মরণ করা হয়। জানা গিয়েছে যে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে তিনি প্রায় ১৬ লক্ষ সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছিলেন।  পাশাপাশি সৈন্যবাহিনীরা খুন করেছিলেন প্রায় ৪০ লাখেরও বেশি মানুষকে। অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি নিরীহ মানুষের প্রাণ গিয়েছিলো চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্যে আধিপত্য বিস্তারের জন্য। 

তবে চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্যঃ দখল  করার একটি নিয়ম ছিল। তিনি প্রথমে শহরের বাসিন্দাদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আদেশ দিতেন। এরপরে সাধারণ মানুষ তাদের কথা না শুনলে তারা অনশনে বসেন। এরপরই প্রায়  অনাহারক্লিষ্ট নগরবাসীর ওপর চালানো হতো অতর্কিত হামলা। যার কারণে ইতিহাসের পাতা সবচেয়ে বড় লুটেরা হিসাবে কুখ্যাত ছিলেন চেঙ্গিস খান। তবে এমন এক মহানায়কের কথা ইতিহাসের পাতায় খচিত থাকলেও তার মৃত্যু ঘটনা নিয়ে বড়ই দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। এবার আসা যাক চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর ঘটনায়।

লোকো ভাষ্যমতে ১২২৭ সালে চীনে  ঘোড়ায় চড়ার সময় পড়ে গিয়ে মৃত্যু হয়েছিল তার। যদিও এই কথাটা বিশ্বাস করা প্রায়  অসম্ভব। কারণ একজন বলিষ্ঠ নেতা যিনি বহু মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছেন তিনি সামান্য একটি ঘোড়া থেকে পড়ে তুচ্ছ কারণে মৃত্যু ঘটেছে ব্যাপারটা বড়ই অস্বাভাবিক। তবুও তাই মানা হয় চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর কারণ হিসাবে। পরবর্তীতে তার মৃত্যুর পর চীন থেকে দেহ নিয়ে আসা হয় মঙ্গলিয়ায়। এবং সমাধিও দেওয়া হয় মঙ্গোলিয়ার কোন এক জঙ্গলে। এখান থেকে শুরু হয় রহস্যের উদ্ঘাটন। 

সম্রাট চেঙ্গিস খানের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে সমাহিত করা হয় মঙ্গোলিয়ার কোন এক জঙ্গলে। সেখানে সমাধিস্থ করার পর তার কবরের উপর থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় শতাধিক ঘোড়াকে। যাতে কবরের উঁচু-নিচু কোন অংশ বোঝা না যায়। এমনকি মহানায়কের শেষকৃত্য যাত্রার যে সকল সাধারণ মানুষ  শেষ যাত্রায় উপস্থিত ছিলেন তাদের গণহত্যা করে চেঙ্গিস খানের সৈন্যরা। তবে এখানেই থেমে থাকেনি। এরপর যেসকল সৈন্যরা চেঙ্গিস খানের কবরে সমাধি দিয়েছেন সেই ২৫০০ শ্রমিককে হত্যা করা হয় অন্য বাহিনীর দ্বারা। যার কারণে চেঙ্গিস খানের মৃত্যু থেকে শুরু করে তার সমাধি পর্যন্ত যে সকল ব্যক্তিরা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তাদের ঝড়ে মূলে  মিটিয়ে দেওয়া হয়। যার কারণে মঙ্গোলিয়ায় কোথায় চেঙ্গিস খানের সমাধি সেটি সম্পর্কে অবগত নয় সেখানকার সাধারণ মানুষ। তবে কেন এত রাখ ঢাক সমাধি নিয়ে!  ইতিহাসবিদদের মতে চেঙ্গিস খানের সমাধিতে নাকি সমগ্র পৃথিবীর অর্ধেক ধন-সম্পদে ঠাসা রত্ন ভান্ডার রয়েছে। জানা যায় সর্বশেষ ১৯৯০ সালে মঙ্গোলিয়ার রাজধানীতে অবস্থিত উলানবাটর স্টেট ইউনিভার্সিটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান দিমাজাব  আরডেনেবাটারি একটি প্রকল্প চালু করেন যার নাম ছিল তিন নদী প্রকল্প। প্রকল্পের মাধ্যমে চেঙ্গিস খানের সমাধি খোঁজার কার্য শুরু করেছিলেন তারা। তবে বহু খোঁজাখুঁজি করার পরেও বিফল হয়েছে তদন্তকারী টিম। এছাড়াও বর্তমানে মঙ্গোলিয়ার বাসিন্দারা আর কোনরকম খোঁজাখুঁজি করতে দেয় না তাদের মহানায়কের সমাধি নিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.