দুশ্চিন্তার কারণেই তৈরি হচ্ছে ঘুমের সমস্যা। সমাধারন করতে কি করবেন?

নিজস্ব প্রতিনিধি – বর্তমান সময়ে ডিজিটাল যুগ হওয়ায় অনিদ্রাতে ভুগছে এমন মানুষের সংখ্যা অনেক। বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে এই সমস্যার প্রভাবটা অনেক বেশি দেখা যায়। ঘুমের সমস্যা বা অনিদ্রাজনিত সমস্যাকে বিজ্ঞানী ভাষায় বলা হয় ইনসোমনিয়া। তবে এই ইনসমনিয়া বা অনিদ্রার সমস্যা আসলে কী?

বিশেষজ্ঞরা রিসার্চ করে জানিয়েছেন, সপ্তাহে তিন দিন বা তার বেশি রাতে ঘুম না আসা, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া, অল্প সময় ঘুম থেকে ওঠার পর ক্লান্তি ভাব ইত্যাদি ইনসোমনিয়া বা অনিদ্রা লক্ষণ। কার্যত এই রোগের অন্যতম কারণ হলো মস্তিষ্কের নিউরোহরমোনাল অসামঞ্জস্য হওয়া। কোন ব্যক্তি অনিদ্রাজনিত সমস্যায় ভুগলে সে কর্মক্ষমতায় বুদ্ধিমত্তা ও মনোযোগ দিতে পারেন না। এছাড়াও তার ওজনাধিক্য, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া সহ আরো কিছু প্রবণতা দেখা দেয়।

 সাধারণত মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তার কারণেই অনিদ্রার সমস্যা হয়ে থাকে। হতাশাগ্রস্থ বা খুব কাছের মানুষের সাথে সম্পর্কের দূরত্ব সৃষ্টি হলে বা দীর্ঘদিন ধরে ক্যাফেইন, নিকোটিন জাতীয় মাদকদ্রব্য গ্ৰহন করলে এই সমস্যা আরো বেশি হয়। পরিবেশগত শব্দ, কায়িক পরিশ্রম না করা বা দিনে ঘুমানোর ফলেও অনিদ্রার সমস্যা দেখা দেয়।  কিন্তু বেশির ভাগ মানুষের অনেকেই জানে না কি করলে অনিদ্রার সমস্যা দূর করা যায়। ফলে অনিদ্রা সমস্যা নিয়েই বছরের পর বছর জীবন যাপন করতে হয়।

 বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য ঘুম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলোর মধ্যে একটি। কিন্তু অনেকেই ঘুম হয় না বলে ঘুমের ওষুধ খান। এটা মোটেও ঠিক নয়। ঘুম না হলে শরীরে নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ঘুম না হওয়া কোনো রোগ নয়, তবে ঘুম না হলে নানা রোগ আক্রমণ করতে পারে। এই সমস্যার কিছু সহজ উপায় আছে যা অবলম্বনে অনিদ্রার সমস্যাটি কাটিয়ে ওঠা যায়।

 ঘুমানোর রুটিন তৈরি করা

বহু গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুম না হলে মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। ঘুম যেকোনো প্রকার অসুস্থতা থেকে শরীরকে শতকরা ৫০ ভাগ সুস্থ করে তোলে। রাতে ভালো ঘুম হওয়ার সাথে ভালো স্বাস্থ্যের একটি বিষয় জড়িয়ে থাকে। প্রতিটা মানুষের শরীরের চাহিদার উপর ঘুম নির্ভর করে। কেউ কেউ আছেন যারা দিনে-রাতে ৫ ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট মনে করেন। আবার কারো কারো ১৫-১৬ ঘণ্টা না ঘুমালে শরীরে অসুস্থতার সৃষ্টি হয়। তবে ভালো নিশ্ছিদ্র ঘুম হলে ৮ ঘণ্টাই যথেষ্ট।

 ১. প্রতিদিন একটি নিদির্ষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠা উচিত। প্রতি রাতে ওই নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর চেষ্টা করা উচিত‌। ছুটির দিন হোক বা অন্য যে কোনো দিন, প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা নিয়ম করা উচিত।

 ২. যেদিন শরীরের বেশি বিশ্রামের প্রয়োজন হবে সেদিন ঘুম আগেই চলে আসবে। আর যেদিন বিশ্রামের কম প্রয়োজন হবে সেদিন ঘুম তুলনামূলক দেরিতে আসবে। প্রতিদিন এভাবে রুটিন মেনে ঘুমালে, শরীর ধীরে ধীরে এই নিয়মের সাথে মানিয়ে নিবে।

৩.রিল্যাক্সেশন পদ্ধতি

ঘুমাতে যাওয়ার আগে শরীর কে রিল্যাক্স রাখা খুব কার্যকর একটি পদ্ধতি। এছাড়াও আরো একটি ভালো পদ্ধতি হলো, ঘুমোতে গেলে অনেক সময় বিভিন্ন রকমের চিন্তা বা উদ্বেগ এসে আমাদের মস্তিষ্ককে ঘিরে ফেলে। ফলে ঘুমানোর আগে গভীর নিঃশ্বাস এর ব্যায়াম করা উচিত। এতে শরীর ও মন দুটোই রিল্যাক্সে থাকে এবং ঘুমের জন্য প্রস্তুত হয়। এজন্য বিছানায় সোজা হয়ে শুয়ে মনে মনে ১-৭ পর্যন্ত আস্তে আস্তে গোনা এবং গভীরভাবে নিঃশ্বাস নেওয়া প্রয়োজন। এর ফলে মন চিন্তামুক্ত হবে। আর মন চিন্তামুক্ত থাকলে ঘুম ও সহজেই চলে আসবে।

 ৪.অনেকেই বিছানায় শুয়ে অনেক রকম কাজ করে থাকে। কেউ ফোনে কথা বলে, কেউ গেমস খেলে, কেউ বা মুভি দেখে, আবার কেউ শুয়ে শুয়ে বই পড়তে থাকে। অনেকে আবার অফিসের কাজ নিয়েও বসে পড়েন। যদি কারোর অনিদ্রার সমস্যা থেকে থাকে তবে এসব কাজ করা বন্ধ করতে হবে।

 ৫. এছাড়াও, অনুভূতিমূলক সমস্যা যেমন দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্ন থাকা, বা হতাশার কারণে বেশিরভাগ মানুষ ইনসোমনিয়া সমস্যায় ভুগতে থাকে। তাই ঘুম না আসার পেছনে কোনো বিশেষ কারণ আছে কিনা তা আগে খুঁজে বের করতে হবৈ। একবার কারণ জানতে পারলে সহজেই এর সমাধান করা যাবে।

 ৬.ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি থেকে দূরে থাকতে হবে।

ঘুম না আসলে অনেকে মোবাইল বা কম্পিউটার নিয়ে সময় কাটায়। কিন্তু এতে ঘুম না আসার সমস্যাটি আরো বেড়ে যায়। ঘুম হওয়া বা ঘুম থেকে জেগে ওঠার ব্যাপারটি নিয়ন্ত্রণ করে মেলাটোনিন হরমোন। যার নিঃসরণ আলোর উপস্থিতিতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। ইলেকট্রনিক স্ক্রিনগুলো একটি নীল রশ্মি নিঃসরণ করে যা অনিদ্রা সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলে। ফলে শরীর থেকে মেলাটোনিন উৎপন্ন হতে বাঁধা পায়। এবং শরীর রিল্যাক্স হতে পারে না। তাই ঘুমানোর অন্তত ১ ঘণ্টা আগে থেকেই ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি থেকে নিজেকে দূরে রাখুন। মোবাইলে অ্যালার্ম দিলেও, মোবাইলকে একেবারে মাথার কাছে রাখবেন না।

 ৭. ভালো অভ্যাস গড়ে তুলুন

আপনার প্রতিদিনের অভ্যাসের প্রতি খেয়াল রাখুন। আপনার কিছু অভ্যাস এই অনিদ্রা সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। যেমন ঘুমানোর আগে ঘুমের ওষুধ বা সিগারেট খাচ্ছেন, যা আপনার ঘুম না আসার আরেকটি অন্যতম কারণ। বা আপনি হয়ত দিনে খুব বেশি পরিমাণে চা বা কফি খাচ্ছেন যার ফলে আপনার ঘুম দেরিতে আসছে।

 ৮. দিনের অন্যান্য অভ্যাস যেমন, অনিয়ম করে ঘুমানো, মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া, ঘুমানোর আগে ভারী খাবার খাওয়া, বা দিনে ঠিকভাবে ব্যায়াম না করা ইত্যাদি ঘুমের ক্ষেত্রে নেগেটিভ প্রভাব ফেলতে পারে।

 ৯. কখনো কখনো অভ্যাস পরিবর্তনের ফলে অনিদ্রা সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তবে এই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে শরীরের বেশ কিছু সময় লাগতে পারে।

 ১০. ঘুমানোর পরিবেশ তৈরি করা।

ভালো ঘুম হওয়ার জন্য যেটা সবচেয়ে বেশি দরকার তা হল ভালো ঘুমের পরিবেশ থাকা। তাই খেয়াল রাখুন আপনার ঘরটি যেন শান্ত, অন্ধকার এবং আরামদায়ক হয়। বিভিন্ন ধরনের শব্দ হলে, বা ঘরে আলো থাকলে, ঘর খুব বেশি গরম বা ঠান্ডা থাকলে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে থাকে।তাই ঘরে যেন কোনো ধরনের শব্দ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। ঘর গরম থাকলে ফ্যান ছেড়ে বা জানালা খুলে দিন। চোখে যেন আলো না পড়ে সেজন্য আই মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.