কেন নন্দীকে নিজের বাহন করেছিলেন ভগবান শিব? কি বলছে পুরাণ?

নিউজ ডেস্কঃ হিন্দুধর্মে সব দেবতারই একটা বাহন থাকে।যেমন- লক্ষ্মী দেবীর পেঁচা, গণেশের ইঁদুর ইত্যাদি।ঠিক এইভাবে আমাদের বিশ্বের সংহারকর্তা মহাদেবের বাহন নন্দী। নন্দী সম্পর্ক আমরা কম বেশি সবাই জানি।যে তিনি মহাদেবের সবচেয়ে বড় ভক্ত এবং তাঁকে  মহাদেবের পাশে রাখা  হয় এবং মহাদেবের সাথে সাথে তাঁকেও পূজা করা হয়। কিন্তু একটা বিষয় বেশিরভাগ মানুষের  কাছে অজানা সেটি হল মহাদেব কেন নন্দীকে তাঁর বাহন করেছিলেন? এই নিয়ে কি বলছে পুরান? 

হিন্দু পুরাণে রুদ্র শহিতা হল আঠারো পুরাণের মধ্যে অন্যতম এক শিব পুরাণ।যেখানে বলা হয়েছে যে নন্দী ভগবান শিবের বাহন হওয়ার পাশপাশি সবার প্রমুখ।এমনকি বলা হয়ে থাকে যে নন্দী মহাদেবেরই অবতার এর উল্লেখ আছে শিব পুরাণে “শতরুদ্র সংহিতা”।এই শিব পুরান অনুসারে,পৌরাণিক কালে শিলাদ নামক এক ব্রহ্মচারী ছিলেন। বয়স বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে তার মনে হতে লাগলো যে তাঁর মৃত্যুর পর তার বংশ সমাপ্ত হয়ে যাবে।এই সময় একদিন তিনি তার পূর্বপুরুষের আদেশ অনুসারে এক মৃত্যুহীন পুত্র পাওয়ার আশায় তিনি দেবরাজ ইন্দ্রের কঠোর তপস্যা করা শুরু করেন।তাঁর তপস্যায় দেবরাজ ইন্দ্র প্রসন্ন হওয়ায় বরদান হিসেবে শিলাদ মুনি তাঁর কাছে এক মৃত্যুহীন পুত্র  চাইলেন। কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র এইরকম পুত্র দেওয়ায় নিজেকে অসমর্থ বলে জানালেন।তখন  ইন্দ্রদেব শিলাদ মুনিকে পরামর্শ দিলেন তাঁকে দেবাদিদেব মহাদেবের তপস্যা করার জন্য। দেবরাজ ইন্দ্রদেবের আদেশ অনুসার শিলাদ মুনি মহাদবের তপস্যা করা শুরু করলেন।দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর মহাদেব তার তপস্যায় প্রসন্ন হয়ে সেখানে প্রকট হলেন।এবং মহাদেব  শিলাদ মুনিকে বর চাওয়ার কথা বলেন।তখন শিলাদ মুনি মহাদেবকে বললেন যে তাঁর সময় এক পুত্র চায় যে মৃত্যুহীন হবে।তখন ভগবান শিব তাঁর পুত্ররূপে জন্মানোর বরদান দিলেন।এবং তিনি শিলাদ মুনিকে যজ্ঞ করতে বলে ভগবান-শিব সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।  কিছু সময় পর শিলাদ মুনি ভগবান শিবের পুজো করছিলেন তখন যজ্ঞকুণ্ড থেকে একটি বালক আবির্ভাব হয়।

শিশুটি অকস্মাৎ চতুর্ভুজ মহারুদ্রের রূপ ধারণ করেন ও মুনিকে পিতা বলে সম্বোধন করেন। তখন শিলাদ তাঁকে তার আশ্রমে নিয়ে যান। আশ্রমে প্রবেশ করতেই তিনি এক বালকে পরিণত হয়। মহর্ষি বালকটির নাম দেন নন্দী।এরপর শিলাদ মুনি ওই শিশুটির জাত, কর্ম এবং বাকি সংস্কার সম্পূর্ণ করলেন।  নন্দীর পাঁচ বছর বয়সেই শিলাদ মুনি তাকে সম্পূর্ণ বেদ এবং অন্যান্য শাস্ত্রেও অধ্যায়ন করালেন।যখন নন্দী সাত বছর বয়সে পা রাখল তখন ভগবান শিবের আদেশ অনুসারে মিত্র ও বরুণ নামে দুই দেবতা নন্দীর পরীক্ষা নিতে যান।তাঁরা ঋষির রূপ নিয়ে শিলাদ ও নন্দীর আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। ঋষিদ্বয় নন্দীকে দেখে শিলাদ মুনিকে বলেন যে তাঁর এই শিশু অল্পায়ু এর আয়ু বেশি দিন নেই।  মনিদের মুখে এমন কথা শুনে শিলাদ মুনি খুবই মর্মাহত হয়ে পড়লেন।পিতার এই রকম অবস্থা দেখে নন্দী তাঁকে  জিজ্ঞাসা করলেন যে তাঁর কি হয়েছে? তখন শিলাদ মুনি নন্দীকে বললেন যে তাঁর অল্পায়ুর কারন সে চিন্তিত।তখন নন্দী তাঁর পিতাকে বললেন যে সে যেহেতু শিবের বরপ্রদ ফল তাই তাকে ভগবান শিবই রক্ষা করবে।পরের দিন নন্দী পিতার আজ্ঞা পেয়ে ভগবান শিবের তপস্যা করার জন্য ভুবন নদীর তীরে চলে গেলেন। এবং সেখানে পৌঁছে তিনি নদীর তীরে বসে শিবের কঠোর তপস্যা শুরু করলেন।নন্দীর কঠোর তপস্যায় প্রসন্ন হয়ে ভগবান শিব সেখানে প্রকট হন। কিন্তু যখন নন্দী যখন মহাদেবকে দেখলেন তখন তিনি ভুলেই গেলেন যে তিনি দীর্ঘায়ুর জন্য তপস্যা করছিলেন।মহাদেব এরপর নন্দীকে বরদান চাওয়ার জন্য বললেন। নন্দী তখন বরদান স্বরূপ শিবের সান্নিধ্য চাইলেন। নন্দী প্রার্থনা করলেন যে তিনি সবসময় তার সাথেই থাকতে চান। তখন মহাদেবের বরে তিনি শিবের প্রিয় অনুচর ও বাহন হন এবং তাকে চিরঞ্জিবী করে দেন।আর এরপর থেকে নন্দী শিবের বাহন হলেন।তিনি শিবের সহচর হওয়ার সাথে সাথে অনেক সময়েই তাকে শিবের অনুচর ‘গণ’বাহিনীর এক নায়ক হিসেবে দেখানো হয়েছে।তাই নন্দীকে ‘গণ’র অধিপতিও  বলা হয়। নন্দীর পূজা আলাদাভাবে কোন প্রচলিত না থাকলেও শিবের পূজা করার সময় নন্দী পূজা করা হয়। বর্তমানদিনে বেশিরভাগ শিবমন্দিরেই শিবমূর্তির ডান পাশে শিবের দিকে তাকিয়ে থাকা একটি ষাঁড়ের মূর্তিতে নন্দীকে স্থাপন করা হয়।   

Leave a Reply

Your email address will not be published.