চীনের দখল করা তিব্বতকে কেন নিষিদ্ধ শহর বলা হত জানেন?

নিউজ ডেস্ক  – তিব্বত দখলকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষের কথা উল্লেখ রয়েছে। কার্যত চীন তাওয়াংকে  নিজের একটি অংশ হিসেবে বরাবরই দাবি করে আসায় একাধিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। যদিও এখন মানচিত্রে তথা আইন অনুসারে চীনের দখলে রয়েছে তিব্বত।  তবে শুধুমাত্র তিব্বত নয় অরুণাচল প্রদেশকেও নিজের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে। যদিও এই বিষয়ে অমত পোষণ করেছে ভারত। 

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে মূলত বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী এমন অঞ্চলগুলো নিয়ে তৈরি হয়েছে তিব্বত। যদিও এটি বিশ্বের ছাদ নামেও পরিচিত।  তবে তিব্বত দখল করার পেছনে যথেষ্ট কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছিল চীনকে।  ১৪০৯ সালে জে শিখামপা জেলাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তিব্বতে। কার্যত এই স্কুলের মধ্যে দিয়েই বুদ্ধ ধর্ম প্রচার করা হতো। এছাড়াও তাজ্জবের বিষয় যে স্থানে বিদ্যালয়টি গড়ে উঠেছিল সেটি ছিল ভারত ও চীনের মধ্যবর্তী অঞ্চল। এই স্কুলের সবচেয়ে গির্জার মতো ছাত্র ছিলেন বালুন গ্রুপ পরে যেটি দালাই লামায়ে পরিণত হয়েছিল। 

সে কারণেই দালাই লামায়কে  বৌদ্ধ ধর্মের রূপক সহ নেতা হিসেবে মান্য করা হতো। প্রাথমিকে দিকে ঠিকই চলছিল সবকিছু তবে ১৬৩০ দশক থেকে তিব্বতের একীকরণের পরে বৌদ্ধ এবং তিব্বত নেতৃত্বের মধ্যে বিক্ষুব্ধ মনোভাব প্রকাশ্যে আসে। এরপরই মাঞ্চু, মঙ্গোল এবং ওরাট দলগুলোর সঙ্গে লড়াই শুরু হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত পঞ্চম দলাই লামার তিব্বত সংস্কৃতিগতভাবে আত্মপ্রকাশ করাতে সক্ষম হয়েছিল।  এরপরই জেলাগ বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা  ১৪তম দালাই   স্বীকৃতি দিয়েছিল। এরপরই ১৯১২ সালে তিব্বতকে  স্বাধীন ঘোষণা করেছিলেন ত্রয়োদশ দালাই লামা। তবে স্বাধীনতার ৪০ বছর পর হঠাৎই তিব্বতে আক্রমণ করেছিল চীন। প্রথমে চীনের আধিপত্য মেনে নিতে পারেনি তিব্বত বাসীরা। তারা রীতিমতো চীনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নেমেছিল। দীর্ঘদিন বিক্ষোভ দেখানোর পরেও তারা সফল হননি। এমনকি সেই সময়কার দালাই লামা মনে করেছিলেন যে তিনি চীনের খপ্পরে পড়ে আছেন তাই বেশ কয়েকজনকে নিয়ে ভারতে ঘাঁটি গেড়ে ছিলেন ১৯৫৯ সালে। সেই সময় তিব্বত ছাড়ার পর থেকেই সারা দেশ জুড়ে সমবেদনা পেলেও এখনো পর্যন্ত তিনি নির্বাসনে জীবন-যাপন করছেন।  

পরবর্তীতে তিব্বত আক্রমণ করার পর ১৯৫০ সালে চীন নিজের দেশের পতাকা পোতার জন্য কয়েক হাজার সৈন্য পাঠিয়েছিল। এরপরই তিব্বতে কিছু অঞ্চল স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের রূপান্তরিত হলেও বাকি অঞ্চল গুলির সঙ্গে চীনা প্রদেশগুলোকে একীভূত করা হয়েছিল।  

অন্যদিকে তিব্বত দখলের প্রসঙ্গে চীনের দাবি ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে তিব্বত চীনের একটি অঙ্গ ছিল। যদিও তিব্বতের দাবি তিব্বত বহু শতাব্দী ধরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিত ,চীনের অধিকারী ছিল না। এই তিব্বতকে প্রতিষ্ঠা করেছিল মঙ্গলের রাজা কুবলাই খান  ইউয়ান রাজবংশ। যদিও সপ্তদশ শতাব্দীতে তিব্বতের সঙ্গে চীনের চীন রাজবংশের সম্পর্ক প্রকাশ্যে এসেছিল। কিন্তু ২৬০ বছরের সম্পর্কের পরে চীন আর্মি তিব্বতকে দখল করেছিল। তবে আবার ১৯৫১ সালের চীনা সেনাবাহিনী তিব্বতকে  আমন্ত্রণ করে এবং সেখানকার প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে তিব্বতের সর্বভৌমত্ত চীনের হাতে স্থানান্তরিত হয়।  

অন্যদিকে চীনের দখলে তিব্বত চলে আসায় এটি সম্পূর্ণ রূপে তখন বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।  চীনা সেনাবাহিনী মোতায়েন করা কালীন সেই সময় তিব্বতে এবং এর রাজধানী লাসায় কোন বহিরাগতদের ঢোকার অনুমতি ছিল না।  যার কারণে তিব্বতের আরেক নাম হয়ে উঠেছিল নিষিদ্ধ শহর।  ১৯৬৩ সালে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপিত করেছিল চীনা সরকার। যদিও ১৯৭১ সালে তিব্বতের দরজা বিদেশীদের জন্য খুলে গিয়েছিল।  

ভারতবর্ষের দখলের প্রসঙ্গে দেশের সরকার বলেছেন,“এ নিয়ে কোনও বিরোধ নেই যে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়কালে তিব্বত বিভিন্ন বিদেশী শক্তির প্রভাবে ছিল। নেপালের মঙ্গোল, চীনের মাঞ্চু রাজবংশ এবং যারা ভারত শাসন করেছিল তিব্বতের ইতিহাসে ব্রিটিশ শাসকদের সবার কিছু ভূমিকা ছিল। তবে ইতিহাসের অন্যান্য সময়কালে, এটি তিব্বতই প্রতিবেশীদের উপর শক্তি ও প্রভাব প্রয়োগ করেছিল এবং এই প্রতিবেশীরা চীনকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। “

“বিশ্বের ইতিহাসে আজ এমন কোনও দেশ খুঁজে পাওয়া মুশকিল যে তার ইতিহাসে কোনও সময় কোনও বিদেশী শক্তির দ্বারা আধিপত্য ছিল না। তিব্বতের ক্ষেত্রে বিদেশী প্রভাব বা হস্তক্ষেপ তুলনামূলকভাবে সীমিত সময়ের জন্য ছিল।”

 চীনের দাবি, “সাত শতাধিক বছরেরও বেশি সময় ধরে চীন তিব্বতের উপর সার্বভৌমত্ব রেখেছে এবং তিব্বত কখনও স্বাধীন দেশ হতে পারেনি। বিশ্বের কোন দেশ তিব্বতকে স্বাধীন দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি। “

চীন তিব্বত দখল করার পরই একে একে এই সত্য মেনে নিতে থাকে একাধিক দেশ। যার মধ্যে ছিল ভারতও।  ২০০৩ সালের জুন মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে তিব্বতকে চীনের অঙ্গ হিসাবে সম্মতি জানিয়েছিল ভারত। সেই সময়কার ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি চীনের রাষ্ট্রপতি জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করার পরই তিব্বতকে চীনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।  কার্যত স্বীকৃতি দেওয়ার পরেই চীন ও সিকিম ভারতের সাথে বাণিজ্য করতে সম্মতি দিয়েছিল। এছাড়াও সিকিমকে ভারতের অংশ হিসেবে সম্মতি জানিয়েছিল চীনও।  

উল্লেখ্য,  চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নরেন্দ্র মোদী যখন অরুণাচল প্রদেশ সফর করেছিলেন , তখন চীন আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর এই সফরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল।চীন তিব্বতের পাশাপাশি অরুণাচল প্রদেশও দাবি করে এবং এটিকে দক্ষিণ তিব্বত বলে অরুণাচল প্রদেশের চীনের সাথে ৩৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানা মনে করে। 

 তবে সরকারি আইন অনুযায়ী বলা রয়েছে তিব্বত ১৯৫১ সালে চীনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল এবং ১৯৩৮ সালে আঁকা ম্যাকমোহন লাইন অনুসারে, অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অংশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.