‘নিরঞ্জন ও নিরাকার একো দেবো মহেশ্বরা’ এই মন্ত্রটি হল দেবাদিব মহাদেবের মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র যার ভয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল স্বয়ং যমরাজকে

নিউজ ডেস্কঃ যমরাজকে আমরা মৃত্যুর দেবতা বলি। বলায় হয় যে যার মৃত্যু যেই দিন লেখা আছে ঠিক সেই দিনেই তার মৃত্যু অনিবার্য তা কেউ খণ্ডাতে পারবে না।কিন্তু আপনার কি জানেন যে একটি বালক তার মৃত্যুকে খণ্ডাতে পেরে ছিল।যমরাজ তার প্রান নিতে এসে ওই বালকের প্রান না নিয়েই ফিরিয়ে যেতে হয়েছিল মৃত্যুর দেবতাকে। কে ছিলেন ওই বালক? যে যমরাজকে হারিয়ে তার প্রান  রক্ষা করতে পেরেছিলেন।    

‘নিরঞ্জন ও নিরাকার একো দেবো মহেশ্বরা’ এই মন্ত্রটি হল দেবাদিব মহাদেবের মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র।ঋকবেদে উল্লেখ পাওয়া যায় এই মন্ত্র বলে মৃত্যুকেও জয় করে নেওয়া যায়।তবে যদি ঠিকঠাক নিয়ম মেনে এই মন্ত্রটি জপ করা যায় তাহলে দেহের অন্দরে দৈবিক শক্তি এতটাই বেড়ে যায় যে মৃত্যু কাছে আসতে ভয় পায়।আর তাই প্রমান পাওয়া যায় যখন যমরাজ একটি বালকের প্রান নিতে আসে তখন।কারন যমরাজ মহাদেবের এই মন্ত্র উপেক্ষা করে প্রাণ নেওয়ার ভুল করেছিলেন কিন্তু পরক্ষণেই তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি শিবকে রুষ্ট করে কত বড় ভুল করেছিলেন।

পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, ঘটনাটি ছিল মৃকণ্ডু ঋষি ও তার পত্নী মরুদবতী  নিয়ে। মৃকণ্ডু ঋষি শিবের আরাধনা করতেন এবং তাঁর পত্নী মরুদবতী ছিলেন দেবী দুর্গার ভক্ত। এই দুই ভক্তের দীর্ঘদিন সংসার জীবন ব্যয় হবার পরেও তাদের কোন সন্তান প্রাপ্তির সৌভাগ্য হয়নি।একদিন মরুদবতীকে মনভার করে বসে থাকতে দেখে মৃকণ্ডু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে দেবী আপনার কি হলো আপনার মন ভার কেন? উত্তরে মরুদবতী বললেন আমার অপূর্ণতার কারণে আমার মন ভার। ঋষি মৃকণ্ডু বুঝতে অসুবিধা হলো না যে সন্তানের অপূর্ণতায় তার মন ভারের কারণ। ঋষি পত্নী মরুদবতী বললেন যে স্বামী আমার একান্ত ইচ্ছা মাতৃত্বের স্বাদ পেতে। পত্নী মুখে এই বাক্য শুনে ঋষি মৃকণ্ডু বললেন তাহলে আমাদের মহাদেবের তপস্যা শুরু করতে হবে।ঋষির এই কথা শুনে তার পত্নী তাঁর কথায় রাজি হয়ে গেলেন।এরপর তারা দুজনে গভীর বনে পুত্র কামনায় ভগবান শিবের আরাধনা শুরু করতে লাগলেন। তাদের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে প্রভু মহাদেব শিব তাদের সম্মুখে উপস্থিত হন। তখন মহাদেব জিজ্ঞাসা করেন তোমাদের মনোবাঞ্ছা কি কেন তোমাদের এই কঠোর তপস্যা? উত্তরে ঋষি মৃকণ্ডু ও মরুদবতি বললেন হে প্রভু পুত্র কামনার জন্যই আমাদের এই তপস্যা। তখন মহাদেব বললেন কেমন পুত্র চাও দীর্ঘজীবী পুত্র কিন্তু মূর্খ হবে সে নাকি ক্ষণজীবী পুত্র কিন্তু জ্ঞানী হবে সে। উত্তরে বললেন ঋষি মৃকণ্ডু বললেন মূর্খ দীর্ঘজীবী পুত্রের চেয়ে ক্ষণজীবী জ্ঞানী পুত্রই শ্রেয়। তখন মহাদেব সেই রুপ বর দান করে এবং সেখান থেকে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তারপর ঠিক এক বছর পর ঋষি মৃকণ্ডু পত্নী মরুদবতী এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন।জন্মের পর মরুদবতী সেই সন্তানের নামকরণ করেন মার্কণ্ডেয়। সন্তান জন্মের পর দিন যখন ঋষি মৃকণ্ডু  পুত্রকে দেখতে চান তখন তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁর পুত্র অত্যন্ত স্বল্পায়ু। ঋষি মৃকণ্ডু পত্নী জানতে চাইলেন কত সময় আয়ু নিয়ে এসেছে আমাদের পুত্র? উত্তরে ঋষি মৃকণ্ডু বললেন যে মাত্র 16 দিন।

ঋষি মুখে এই বাক্য শুনে মোরুদবতী স্তম্ভ  হয়ে গেলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে বলেন যে মাতা আদ্যা শক্তি এ কেমন অবিচার আমাদের ওপরে। এই যদি আপনার ইচ্ছা তাহলে কেন এই বরদান দিয়েছিলেন প্রভু মহাদেব। এরপর মরুদবতী পুত্র মার্কণ্ডেয়কে  নিয়ে কৈলাসের পথে এগোলেন।দ্বিতীয় দিনে মরুদবতী কৈলাসে  উপস্থিত হয়ে নিজ পুত্রকে আদ্যা শক্তি দেবী দুর্গার পায়ে রেখে দিলেন এবং তাঁর পুত্রের দীর্ঘায়ু কামনা করতে লাগলেন।তখন দেবী দুর্গা তার ভক্তের ইচ্ছা পূরণের জন্য ধ্যানে বসলেন এবং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মকে স্মরণ করলেন ধ্যান অবস্থায়  দেবী দুর্গা ব্রহ্মাকে বললেন যে এই পুত্রের অল্পায়ুর কারণ কি এবং তিনি এই সন্তানের আয়ু বৃদ্ধির জন্য কামনা করতে লাগলেন ব্রহ্মার কাছে। তখন ব্রহ্মা বললেন এই সন্তানের আয়ু মাত্র 16 দিন তবে আপনার ইচ্ছা পূর্ণ করার জন্য আমি এই সন্তানে আয়ু স্বর্গের সময় অনুসারে 16 দিন প্রদান করছি যা মর্ত্যলোকের সময় অনুসারে 16 বছর হবে এর উর্দ্ধে আয়ু প্রদান করার ক্ষমতা আমার নেই বললেন ব্রহ্মা। এরপর আট বছর পর্যন্ত মার্কণ্ডেয় কৈলাসে অবস্থান করতে থাকে এবং যখন মার্কণ্ডেয় বয়স 8 বছর অতিক্রম করে তখন দেবী দুর্গা মার্কণ্ডেয়কে একটি শিবলিঙ্গ তৈরি করে দেয় এবং তাকে মহামন্ত্র প্রদান করে। দেবীদুর্গা মার্কণ্ডেয়কে আরো বললেন পুত্র যত কিছুই হোক তুমি এই মন্ত্র জপ করা বন্ধ করবে না এবং এই শিবলিঙ্গ থেকে প্রস্থানের মনভাব আনবে না। তখন মার্কণ্ডেয় জিজ্ঞাসা করলেন মাতা এই মন্ত্র  কিসের?  উত্তর দেবী দুর্গা মার্কণ্ডেয়কে বললেন  এটি মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র। এই মন্ত্রটি তোমার ভাগ্য নির্ধারণ করবে। এভাবে মার্কণ্ডেয় প্রায় 16 বছর বয়স পর্যন্ত সেই শিবলিঙ্গের সম্মুখে মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করতে থাকে। এরপর একদিন যখন মার্কণ্ডেয়  16 বছর পূর্ণ হয়ে যায় তখন যমরাজ তাকে নিতে এলে মার্কণ্ডেয় সেই শিবলিঙ্গটি  ছেড়ে যেতে অস্বীকার করে। যম তার রজ্জু দিয়ে মার্কণ্ডেয়কে বন্ধন করলে, মার্কণ্ডেয় শিবলিঙ্গটিকে আঁকড়ে ধরে এবং শিবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকে।

করুণাময় ভগবান শিব ভক্তের এইরকম দুর্দশা দেখে শিবলিঙ্গ থেকে আবির্ভূত হন এবং তিনি অত্যন্ত ক্রোধিত অবস্থায় থাকেন। যমরাজ তার এই রূপ দেখে অত্যন্ত ভয় পেয়ে যান। যমরাজ বলেন হে প্রভু আমাকে ক্ষমা করবেন আপনার বরদান অনুযায়ী ঠিক এই সময়ে এই বালকটির প্রাণ নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল আমার। এই কথাটি শোনার পর মহাদেবের ক্রোধ শান্ত হয়।এরপর মহাদেব বলেন মার্কণ্ডেয়ের আরাধনায় আমি প্রসন্ন হয়েছি এবং মার্কণ্ডেয়কে দীর্ঘায়ু করার বর প্রদান করছি।তুমি এখন আর ওকে নিয়ে যেতে পারবেনা। যমরাজ মহাদেবের কথায়  মার্কণ্ডেয় প্রাণ না নিয়েই সেখান থেকে প্রস্থান করেন। এরপর মহাদেব মার্কণ্ডেয়কে  বলেন পুত্র তোমাকে আর মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করতে হবে না কারণ তোমার জপ শক্তির প্রভাবে তোমার আগের 16 দিন আয়ু এখন ষোলোশো কল্পে পরিণত হয়েছে। এই বর দান দিয়ে মহাদেব অদৃশ্য হয়ে যান। ঠিক এইভাবে ঋষি মার্কণ্ডেয় মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করে  অমরত্ব লাভ করেন। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.