পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে কেন অর্জুনের সারথি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ?

নিউজ ডেস্কঃ আমার সবাই জানি যে মহাভারতের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের সারথি ছিলেন।তিনিই অর্জুনের রথ চালাতেন।কিন্তু আপনাদের মনে কি কখন এই প্রশ্নটা আসে যে কেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সব পান্ডবদেবের ছেড়ে শুধু অর্জুনেরই সারথি হয়েছিল?

শ্রীকৃষ্ণ পঞ্চপাণ্ডবদের মধ্যে সবথেকে অর্জুনকে বেশি ভালোবাসতেন।মহাভারতের যুদ্ধের সময় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের সারথি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তখন অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে প্রশ্ন করেন যে  আমাদের পাঁচ ভাইয়ের জন্য আপনার আশির্বাদ যথেষ্ট তাহলে আপনি কেন আমার সারথি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন? অর্জুনের করা এই প্রশ্নটি শুনে  শ্রীকৃষ্ণ হাসতে লাগলেন।তিনি অর্জুনকে বলেন যে এই মুহূর্তে এই প্রশ্নের জবাব তিনি  দিতে পারবেন না সময় আসলে তুমি নিজেই ঠিক বুঝতে পেরে যাবে।

মহাভারত যুদ্ধ হবে বলে যখন নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল তখন কৌরব ও পাণ্ডবদের তাঁরা তাদের মিত্রদের সাহায্য নিয়ে রাজাদেরকে নিজেদের পক্ষে আনার প্রচেষ্টা করতে থাকেন।ঠিক ওই সময় শ্রীকৃষ্ণের কাছে গেলেন পান্ডবদের মধ্য থেকে অর্জুন এবং কৌরবদের মধ্য থেকে দূর্যোধন। তাঁরা  শ্রীকৃষ্ণ কাছে গেলে তিনি তাদেরকে বলেন যে তাঁরা দুজনেই তাঁর খুব কাছের এইজন্য তিনি দু’জনকেই আমি কিছু না কিছু দেবে বলে জানান। তখন শ্রীকৃষ্ণ তাদের সামনে একদিকে রাখে তাঁর পুরো নারায়ণী সেনা এবং অন্যদিকে রাখে স্বয়ং নিজেকে এবং তাঁর সাথে তিনি বলেন যে তিনি এই যুদ্ধে সম্পূর্ণ একা এবং কোন অস্ত্র ধারন করবে না।শ্রীকৃষ্ণের এই কথা শুনেও অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে নির্বাচন করেন ও অন্যদিকে দুর্যোধন নারায়ণী সেনা পেয়ে খুব খুশি হলেন এবং  তিনি ভাবলেন যে শ্রীকৃষ্ণ  এই যুদ্ধে সম্পূর্ণ একা ও কোন অস্ত্র ধারন করবেন না তাহলে তিনি কি বা করতে পারবেন। এই ভেবে দুর্যোধন নারায়ণী সেনা নিয়ে সেই স্থান থেকে প্রস্থান করলেন। এরপর মহাভারতের যুদ্ধ এর প্রস্তুতি করতে লাগলেন কৌরব ও পাণ্ডবরা।তখন  শ্রীকৃষ্ণ সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি এই যুদ্ধে অর্জুনের সারথি হবেন।যেদিন যুদ্ধ শুরু হল সেদিন শ্রীকৃষ্ণ ঠিক একজন সারথীর মতো তাদের রথ পুরোপুরি ভাবে তৈরি করে অর্জুনের অপেক্ষা করছিলেন। অর্জন যুদ্ধের জন্য অস্ত্রশস্ত্রের সাথে শিবির থেকে বের হলেন।

অর্জুনের বেরোনোর পর শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন যে রথে চড়তে এবং তারপর তিনি নিজেও উঠলেন রাথে। এরপর অর্জুনের আদেশ অনুসারে নিয়ে যুদ্ধে ভূমির দিকে রথ নিয়ে যেতে লাগলেন শ্রীকৃষ্ণ।অর্জুন কুরুক্ষেত্রে পৌঁছে পর যখন তার সামনে দেখলে যে ভীষ্ম পিতামহ ও গুরু দ্রোণাচার্য মতো ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন তখন তার হাত কাঁপতে লাগল এবং তিনি তার ধনুকটি নামিয়ে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে বলেন যে সে এই যুদ্ধ করতে পারবো না কারন সে নিজের লোকেদের সাথে কিভাবে যুদ্ধ করবে? তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর দিব্য রূপের দর্শন দেন তার সাথে ভাগবত গীতার উপদেশ দেন। তারপরই অর্জুন এই যুদ্ধ করার জন্য তৈরি হলেন। অর্জুন যুদ্ধের জন্য তৈরি হবার পরই দুই পক্ষ থেকে যুদ্ধ শুরু করার জন্য শঙ্খ বাজানো হলো।কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কর্ণ যুদ্ধের ১১ তম দিনে যুদ্ধক্ষেত্রে এলেন।তারপরই দুই পক্ষের মধ্যে প্রবল যুদ্ধ হতে লাগল।এই যুদ্ধের সময় অর্জুনের তীর কর্ণের রথে লাগলে কর্ণ রথ সমেত কয়েক হাত পেছনে চলে গেল ঠিক এভাবে যখন কর্ণের তীর অর্জুনে রথের লাগল তখন অর্জুনের রথও পাঁচ হাত পেছনে চলে গিয়েছিল। এই দেখে শ্রীকৃষ্ণ কর্ণের প্রশংসা করতে থাকেন।কৃষ্ণের মুখে বারবার কর্ণের প্রশংসা শুনে অর্জুন ক্রোধিত হয়ে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে বলেন যে সে কেন তাঁর  প্রশংসা না করে কর্ণের প্রশংসা করছেন? তখন শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন যে  এই রথে স্বযং তিনি বিরাজমান তা সত্ত্বেও এই রথ কর্ণের প্রহরে পাঁচ হাত পেছনে গিয়ে পড়ছে।এই জন্য তাঁর থেকে কর্ণ বেশি প্রশংসার যোগ্য। এইভাবে যুদ্ধ চলতে লাগলো।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সবসময় অর্জুনের আগে রথ থেকে নামতেন।কিন্তু যুদ্ধের ১৮ তম দিন  শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে আগে রথ থেকে নামতে বলেন।এই  শুনে অর্জুনের মনে একটু খটকা লাগল।কারন  অন্যান্য দিন শ্রীকৃষ্ণ নিজের আগের থেকে নামতেন তারপর অর্জুনকে নামাতেন।তাও  শ্রীকৃষ্ণের আদেশ মেনেই অর্জুন রথ থেকে নেমে গেলেন।শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন দুজনেই রথ থেকে নেমে  কিছুদূর যাওয়ার পরই রথে আগুন লাগতে শুরু করলো এবং কিছুক্ষণ পর পুরো রথা পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। এই দেখে অর্জুন অবাক হয়ে যায়।এবং তিনি ভাবেন যে এত  শক্তিশালী রথ যেটি নিজে কয়েকশো মহারথিকে  বিনাশ করেছে তা আজ  কিভাবে ভস্ম হয়ে গেল? তখন অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের কাছে এর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন যে এই রথ অনেক আগেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যখন ভীষ্ম পিতামহ দ্রোণাচার্য ও কর্ণের মতো মহারথীরা তাদের দিব্যাঅস্ত্র দিয়ে এই রথের ওপর প্রহার করেছে তখনই  এই রথের আয়ু  শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি যদি তাঁর সারথি না হত তাহলে এই রথ অনেক আগেই ধ্বংস হয়ে যেত।তাই তিনি বলেন যে এই সবই ছিল তাঁর লীলা।শ্রীকৃষ্ণের কথা শুনে অর্জুনের বুঝতে পারেন যে  কেন শ্রীকৃষ্ণ নিজে থেকে অর্জুনের সারথি হতে চেয়ে ছিলেন।আর এইভাবে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে করা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলেন। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.