হিজড়ে বা বৃহন্নলা কত রকমের হয় জানা আছে?

নিউজ ডেস্ক সমাজে নারী পুরুষ ছাড়াও অন্য এক ভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষ রয়েছে যাদের বলা হয় তৃতীয় লিঙ্গ। যদিও বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সমাজে আলাদা করেছেন কিন্তু আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার আছে তাদেরও। এসকল বৃহন্নলাদের বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অনেকেই ছক্কা, হিজরা, হিজরে, মাসি ইত্যাদি বিভিন্ন অশ্লীল ভাষায় ডাকেন বহু মানুষ। কিন্তু প্রকৃতির পরিহাসের শিকার হয়ে আজ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের পরিণত হয়েছে সমাজের কিছু সংখ্যক ব্যক্তিরা। বিজ্ঞানী ভাষায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ কিভাবে হয় এবং কেনই বা আর পাঁচজনে থেকে তাদেরকে আলাদা করে তার সেই বিষয়ে সবিস্তারে বিশ্লেষণ করা  হয়েছে। 

বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় হরমোন ইস্যুর জন্য কোন ব্যক্তি নাই সম্পূর্ণ পুরুষ আর নাই সম্পূর্ণ নারীতে পরিণত হন। পুরুষ ও নারীর মধ্যেখানে কোন স্থান পেলে তাদের বৃহন্নলা বলে জানা যায়। এবার আসা যাক শারীরিক গঠনাকৃতি দিকে। উন্নত প্রযুক্তি বিজ্ঞানের মতে, নারী শরিরে রয়েছে বার্থোলিনের গ্রন্থি । যা বৃহৎ ভেসটিবিউলার গ্রন্থি নামেও পরিচিত। এই দুটি গ্রন্থি নারীর যোনির প্রবেশদ্বারের কাছে একটু নীচে ডানে ও বামে থাকে। খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকে এই গ্রন্থি দুটি সম্পর্কে প্রথম ড্যানিশ শরীরবিদ ক্যাসপার বার্থোলিন দ্য ইয়াঙ্গার (১৬৫৫-১৭৩৮) এদের বর্ণনা দেন। এই বিজ্ঞানীর নামে এই গ্রন্থদ্বয়ের নামকরণ করা হয়। গ্রাফেনবার্গ স্পট বা জি-স্পট, হচ্ছে যোনিপথের একটি ক্ষুদ্র অংশবিশেষ। এই অংশটি মূত্রথলির নীচে অবস্থিত। এর নামকরণ করা হয়েছে জার্মান স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ আর্নেস্ট গ্রাফেনবার্গের নামানুসারে। যোনিপথের শুরু হতে ১-৩ ইঞ্চির মাঝেই এর অবস্থান। সঙ্গমকালে যোনিমুখের ১-৩ ইঞ্চির ভিতরে নারী সবচেয়ে বেশি পুলক অনুভব করে। এই অধিক সংবেদনশীল অংশকেই জি-স্পট বলা হয়। এছাড়াও কমবেশি প্রায় সকলেই জানেন নারী শরিরে এক রকমের ই ক্রোমোজোম থাকে যেটি হচ্ছে X ক্রোমোজোম। অন্যদিকে পুরুষের শরীরের দু’রকমের ক্রোমোজোম থাকে একটি X ও অপরটি  Y। জানা যায় X ও Y ক্রোমোজোম দুটির ত্রুটি বিচ্যুতির  কারণে তৃতীয় লিঙ্গের  মানুষের জন্ম হয়। তবে সমাজের তিন প্রকারের বৃহন্নলা দেখা যায়। প্রকৃত বৃহন্নলা, অপ্রকৃত পুরুষ বৃহন্নলা এবং অপ্রকৃত স্ত্রী বৃহন্নলা। 

দীর্ঘ রিসার্চ করে বৈজ্ঞানিকরা জানিয়েছেন,

অপ্রকৃত বৃহন্নলা হলো –  কোন নারী অন্তঃসত্বা হওয়ার পর ক্রোমোজোমের ত্রুটি বিচ্যুতি ঘটলে আর পাঁচটি সাধারন শিশুর মতো এসব শিশুদের ও হাত-পা হলেও যৌনাঙ্গে বিকলঙ্গ দেখা যায়। আর এই যৌন বিকলাঙ্গ শিশুরাই তৃতীয় লিঙ্গ বা সমাজের ভাষায় হিজড়েতে পরিণত হয়। অপ্রকৃত বৃহন্নলাদের পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়। ১) ক্লাইনেফেলটার সিনড্রোম: এই সিনড্রোমের ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির শারীরিক ত্রুটি শুধুমাত্র পুরুষদের ক্ষেত্রে দেখা যায়।  প্রতি ১০০০০ পুরুষের মধ্যে একজনের ক্ষেত্রে এটি প্রকাশ্যে আসে। শারীরিক গঠনে পুরুষালি পেশির ঘাটতি দেখা দেয়। মুখে দাড়ি-গোঁফ, যৌনাঙ্গে চুল কম দেখা দেয়। বক্ষ কিছুটা উন্নত হয় ও স্ফীত স্তন দেখা দেয়। ডাক্তারি পরিভাষায় একে গাইনিকোমাস্টিয়া বলে। তবে মাত্র ১০% পুরুষের গাইনিকোমাস্টিয়া লক্ষণযোগ্য হয়। বাকিদের গঠন স্বাভাবিক পুরুষের মতোই। এদের শুক্রাশয় স্বাভাবিকের তুলনায় ছোটো থাকে। সেখানে শুক্রাণু উৎপন্ন হয় না। এরা সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হলেও স্বাভাবিক যৌন জীবন পালন করতে পারে। এরা মানসিক জড়তায় ভোগে। ২) XXY পুরুষ : আপাত গঠন পুরুষের মতো। এদের যৌনাঙ্গের অস্বাভাবিকতা বয়ঃসন্ধিকালের ভিতরে প্রকাশ পায়। শিশ্ন আছে। তবে মূত্রছিদ্রটি শিশ্নের স্বাভাবিক স্থানে থাকে না। ডাক্তারি ভাষায় একে হাইপোস্পেডিয়াস  বলে। এদের অণ্ডকোশ শরীরের অভ্যন্তরে থাকে । একে বলে গুপ্ত শুক্রাশয়। ৩) XX পুরুষ : XX পুরুষের সঙ্গে ক্লাইনেফেলটার সিনড্রোমের অনেক মিল আছে। প্রতি ১০,০০০০ জনের ভিতর ৪ অথবা ৫ জনের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এদের স্তন থাকে। তবে সুডৌল, স্ফীত স্তন নয়। এদের অত্যন্ত ক্ষুদ্র, ২ সেন্টিমিটারেরও ছোটো শুক্রাশয় থাকে। সেখানে শুক্রাণু  উৎপন্ন হয় না। এদের হাইপোস্পেডিয়াসের সমস্যা থাকে। এরা বেঁটে হয়। ৪) XY  পুরুষ:   আপাতদৃষ্টিতে মহিলাদের ক্ষেত্রে এই সিনড্রোম দেখা দেয়। জন্মের প্রথম তিন বছর এদের উচ্চতা স্বাভাবিক দেখা দিলেও এরপর থেকে উচ্চতা বৃদ্ধির হার কমে যায়। যোনিকেশ খুব কম দেখা দেয়। সাধারণত বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই মেয়েদের ডিম্বাশয় থেকে সেক্স-হরমোন ইস্ট্রোজেন  ও প্রোজেস্টেরন  নির্গত হওয়া শুরু করে। কিন্তু টার্নার সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে সেক্স-হরমোনের প্রকাশ ঘটে না। ফলে রজঃচক্র বা মাসিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। প্রশস্ত বুকে স্তন গ্রন্থির উদ্ভব হয়। গলার দু-দিকের পুরু মাংসল কাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এদের বধির হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল থাকে। এরা অস্থি সংক্রান্ত বিভিন্ন অসুবিধা ও অস্বাভাবিকতায় ভোগে।অনুন্নত ডিম্বাশয় ও গর্ভধারণে অক্ষম হলেও টার্নার সিনড্রোমে আক্রান্ত কারও কারও স্বাভাবিক যোনিপথ ও জরায়ু থাকে।কারও কারও ক্ষেত্রে গণিত শিক্ষা অথবা স্মৃতি ধারণ ক্ষমতায় ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ৫) মিশ্র যৌন গ্রন্থির বিকৃতি : গোনাড হল দেহের সেক্স অর্গান। পুরুষের থাকে শুক্রাশয় আর নারীর থাকে ডিম্বাশয়। MGD সিনড্রোম-ধারীদের আপাতদৃষ্টিতে পুরুষ বলে মনে হয়। শুক্রাশয় থাকে তবে একটি। এর গঠন জটিল আকারের। প্রতিটা শুক্রাশয়ে ৪০০-৬০০টির মতো শুক্রোৎপাদক নালিকা থাকে। এর ৫টি স্তর- স্পার্টাগোনিয়া  প্রাথমিক স্পার্টোসাইট, গৌণ স্পার্মাটোসাইট, স্পার্মাটিড  ও স্পার্মাটোজোয়া। এই পাঁচটি পর্যায়ের মধ্য দিয়েই শুক্রাণু তৈরি হয়। কিন্তু এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উল্লিখিত ৫টি পর্যায়ে বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে শুক্রাণু গঠন হয় না। শিশ্ন থাকা সত্ত্বেও এদের শরীরে যোনি, জরায়ু  ও দুটি ফেলোপিয়ান নালির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। বিকৃত যৌনগ্রন্থির উপস্থিতির ফলে এদের জননকোশের উৎপত্তি স্থানে গোনাডাল টিউমার  দেখা দিতে পারে। ২৫% MGD আক্রান্ত ব্যক্তিদের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

প্রকৃত বৃহন্নলা – এদের শরীরে শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয় উভয়ই অবস্থান নেয়।এরা অধিকাংশই পেশীবহুল শরীরের অধিকারী থাকে। শিশ্ন থাকে।অল্প হলেও কারও কারও শিশ্নের বদলে যোনি থাকে। এবং ভগাঙ্কুর  স্বাভাবিকের তুলনায় বড়ো থাকে অনেক সময় তা পুরুষ শিশ্নের মতো হয়ে থাকে। এদের মূত্রনালি ও যোনিপথ একসঙ্গে থাকে। একে বলে ইউরোজেনিটাল সাইনাস। ফেলোপিয়ান নালি ও জরায়ু  থাকে। জরায়ু অত্যন্ত ছোটো হয়। চিকিৎসার ভাষায় একে বলে হাইপোপ্লাস্টিক বা ইউনিকরনেট। কৈশোরে স্তন গ্রন্থির প্রকাশ ঘটে ও রজঃচক্র শুরু হয়। যাদের বাহ্যিক জননাঙ্গ পুরুষের মতো অর্থাৎ শিশ্ন আছে তাদেরও রজঃচক্র হয়ে থাকে। একে বলে সাইক্লিক হেমাচুরিয়া। এই ধরনের রজঃচক্রের সময় শুক্রাশয়ে ব্যথা হয়।

ক্রোমোজোম ত্রুটি বিচ্যুতির কারণ এই প্রাকৃতিক নিয়মে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ তৈরি হলো প্রাকৃতিক ভাবে ইচ্ছাকৃত করে দেহে অস্ত্রোপচার করে এবং ব্যক্তি নিহত হয়েছেন তাদের জোর করে পরিণত করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বৃহন্নলা বড় হওয়া কে বলা হয় খোজাকরন প্রক্রিয়া যা  সম্পূর্ণরূপে বেআইনি। বহু পুরুষ আর্থিক উপার্জনের ক্ষেত্রে অথবা সুষ্ঠু দেখতে পুরুষদের জোর করে বৃহন্নলাদের পরিণত করে দেহ ব্যবসায় নামানো হয়। খোজাকরন অর্থাৎ অঙ্গ অপসারণ প্রক্রিয়াটি স্থানীয় হাতুড়ে ডাক্তারের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করে থাকেন অসাধু ব্যক্তিরা। তবে বিশেষ জ্ঞান লাভ না হওয়ায় এবং হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে এই অস্ত্রোপচার করেন অপারেশনের সময় বহু রক্তক্ষরণ হয় রোগীদের যার কারণে চিকিৎসা চলাকালীন মৃত্যু হতে দেখা গেছে  বহু মানুষের। তবে অনেকেই খোজাকরন প্রক্রিয়ার সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সম্প্রদায় প্রচলিত খতনাকে গুলিয়ে ফেলেন। আসলে খতনা হলো পুরুষাঙ্গের বর্ধিত ত্বক কাটা বা সার্জারির মাধ্যমে কিছুটা অপসারণ করা। তবে এই প্রক্রিয়াটি শুধুমাত্র মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নয় খ্রিস্টান, যৌন সহ একাধিক সম্প্রদায়ে এই রীতি রয়েছে যেটি সম্পর্কে অবগত নন অধিকাংশ মানুষই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.