কেবলমাত্র মহিলাদের জন্য বাজার রয়েছে ভারতবর্ষের কোন রাজ্যে?

নিউজ ডেস্ক –  ইমা কেইথেল সম্পর্কে অনেকেই অবগত আবার অনেকেই অবগত নন। মনিপুরী শব্দ ইমা কেইথেলের বাংলা অর্থ হচ্ছে মায়ের বাজার। অর্থাৎ এমন একটি মহিলা সংগঠন রয়েছে যারা গোটা বাজার জুড়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। কোনরকম পুরুষ বিক্রেতা নেই এই বাজারে। শুধুমাত্র মেয়েরাই রয়েছে যারা বিভিন্ন ধরনের ঘরোয়া সামগ্রী থেকে শুরু করে শাক সবজি, মাছ, ধাতু নির্মিত আসবাবপত্র ইত্যাদি বিক্রি করে। এই বাজারে ৫ হাজারেরও বেশি মহিলা বিক্রেতা রয়েছে। এদের বার্ষিক টার্নওভার ৪০ থেকে ৫০কোটি টাকা। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের গড় বার্ষিক আয় ৭৩ হাজার টাকা। তবে এই মহিলা বাজার ঠিক কবে নির্মাণ হয়েছিল সে সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে পারেনা। কারো মতে ১৬ শতকে আশেপাশে তৈরি হয়েছিল এই মহিলা বাজার। তবে প্রাথমিক দিক থেকে বাজারটি এলোমেলোভাবে থাকলেও সম্প্রতি খয়রামবান বাজার নামে গোটা বাজারটাই আরসিসি স্ট্রাকচারের একটা সীমাবদ্ধ জায়গায় বেঁধে ফেলা হয়েছে। 

তবে ইমা কেইথেল সম্পর্কে ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় মনিপুরী মহিলাদের ভূমিকা কতখানি। কারণ সমাজে কোনো রকম সংকট দেখা দিল ইমা কেইথেলের মহিলারা সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন। এদের মধ্যে যিনি প্রধান তিনি পান নেত্রীর মর্যাদা। জানা গিয়েছে ২০০০ সালের ২রা নভেম্বর ইম্ফলের মালোম শহরে অসম রাইফেল দশজন সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। যাদের মধ্যে ছিল ৬২ বছরের বৃদ্ধা ১৮ বছরের যুবতীও। এই খবর পেয়ে ইরম শর্মিলা চানু প্রায় ৩০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে নিজের গ্রামে ইমাদের সঙ্গে শলা-পরামর্শ করতে যান। এরপরেই নিজের মায়ের কাছে অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে যান তিনি। 

পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ১০ই জুলাই ইম্ফল শহরের কাছেই বামন কাম্পু মাধা লেইকাই গ্রামের মেয়ে থাউজাম মনোরমাকে অসম রাইফেলসের ১৭ নম্বর ব্যাটালিয়নের কয়েকজন সৈন্য বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। গ্রেফতার করার পরের দিন এই মনোরমার বুলেট বিদ্ধ মৃতদেহ একটি টিলার নীচে পাওয়া যায়। তার মৃত্যুর কারণ শুধুমাত্র বুলেট বিদ্ধ হয়ে হয়নি। পরবর্তীতে জানা গিয়েছে তাকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। 

এক মহিলার দর্শনকে কেন্দ্র করে ইমা কেইথেলে মায়েরা একত্রিত হয়ে যে জোট বাঁধেন। এক হতে মশাল আর অন্য হাতে বস্ত্র তৈরীর তেম নিয়ে কয়েকজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রী কাছে প্রতিবাদ জানায়। ১৫ই জুলাই ইম্ফলের কাংলা দুর্গে অসম রাইফেলের সদর দফতরের সামনে ১২ জন মহিলা ঐতিহাসিক নগ্ন বিক্ষোভ জানায়। সেই বিক্ষোভে তাদের হাতে যে ব্যানার ছিল তাতে লেখা ছিল ‘ভারতীয় সেনা আমাদের ধর্ষণ করো, আমাদের হত্যা করো। আমরা প্রত্যেকে মনোরমার মা’।এই বিক্ষোভ কর্মসূচি শুধুমাত্র মনিপুর কিংবা ভারত নয় বিশ্বের গোটা প্রান্তকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। 

যদিও সেই সময় ইমাদের প্রতিবর্তী বেশি থাকলেও বর্তমানে সেটি কোথাও যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। আকিকার নিয়ম অনুযায়ী কেইথেলের  একজন বয়স্ক ইমা অক্ষম হয়ে গেলে তার মেয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে বসতেন। কিন্তু বর্তমানে স্থায়ী কেইথেল পর্যটকদের দর্শনীয় স্থান হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পড়াশোনা জানা কম বয়সী মেয়েরা ধারাবাহিকভাবে আগের মতোই ইমা হতে চাইছে না। আবার অনেক জায়গায় গ্রামের মেয়েরা পড়াশোনার থেকে কেইথেলে গিয়ে বসাই লাভ দায়ক মনে করছে। বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সকল  প্রক্রিয়া, ঘন ঘন বনধ, কারফিউ, পথ অবরোধে এই সব দায়ী। অনেকে অনেকেই এই বিষয়ে চিন্তিত যে করপোরেশনে ঝোড়ো হাওয়ায় কোথাও হারিয়ে না যায় কেইথেলের ঐতিহ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published.