ভারতবর্ষে আমেরিকার কত জন প্রেসিডেন্ট এসেছেন। কতোটা সফল নরেন্দ্র মোদী?

নিউজ ডেস্ক –  দেশের উন্নতির জন্য বহু বিদেশি প্রেসিডেন্ট ঘুরে গিয়েছেন ভারতে। তবে এটা কি কেউ জানেন আমলে ঠিক কতজন বিদেশি এসেছিলেন এখানে? সবার স্মৃতিতে কমবেশি কয়েকজনের নাম আসলেও সম্পূর্ণরূপে সকল প্রেসিডেন্টের নাম ও না একটু কষ্টকর ব্যাপার। সকলের সুবিধার্থে এবং পুনরায় মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য এই প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছে। তবে সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট যিনি এই দেশে পা রেখেছিলেন তিনি হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই কথাটি বাচ্চা হোক কিংবা বুড়ো সকলেরই প্রায় মনে রয়েছে। তাহলে আসুন একটু সবিস্তারে অতীতের কথাও একবার করে মনে করে নেওয়া যাক। 

১) ড্যুইট ডি আইজেনহওয়ার – তিনি প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন যিনি ১৯৫৯ সালে ভারত সফরে এসেছিলেন।  স্বাধীনতার পর কোন বিদেশের প্রেসিডেন্ট এই দেশে আসায় রীতিমত ঢল পড়ে গিয়েছিল মানুষের। তখন ভারতের স্বাধীনের পর দেশের শাসনভার ছিল প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর হাতে। চার দিনের ভারত সফরে এসেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এই চারদিনের নেহেরুর সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপ করার পাশাপাশি সাংসদের প্রত্যেকটি সদস্যদের সঙ্গে করমর্দন করেছিলেন তিনি। এমনকি নিজের স্বপ্নের জায়গা তাজমহল পরিদর্শন করেছেন। ভারতে প্রথম পা রাখা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে গান স্যালুট জানাই উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু।

২) ‌রিচার্ড এম নিকসন – ভারতের পা রাখা দ্বিতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হলেন রিচর্ড এম নিকসন। তবে দেশের উন্নতির জন্য এই সফর করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। চাপানউতোরের মাধ্যমে শোনা যায় তখনকার অর্থাৎ ১৯৬৯ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে একপ্রকার সম্পর্কের কথা উঠেছিলো মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে। কার্যত সেই গুঞ্জনের ইতি টানতে ভারত সফর করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সময়টা ছিল খুবই কম অর্থাৎ এক দিনেরও কম সময় তিনি ভারতে ছিলেন। পরবর্তীতে ভারতের উপর ক্ষোভ তৈরি হওয়ায় ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের সময়  মিত্রশক্তি পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন তিনি। এমনকি সেই সময় ভারতের সম্বন্ধে মন্তব্য করে জানিয়েছিলেন পিচ্ছিল এবং বিশ্বাসঘাতক হচ্ছে ভারতের মানুষ। সেই সময় কার প্রধানমন্ত্রীর আমলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে খুব একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি ভারতের।

৩)জিমি কার্টার –  ভারতের চতুর্থ  প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের আমলে অর্থাৎ ১৯৭৮ সালের জানুয়ারি মাসে ভারত সফরে আসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। মূলত তিন দিনের ভারত সফরে তিনি পার্লামেন্টের ভাষণ দিয়েছিলেন পাশাপাশি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ১৯৭৪ সালে পারমাণবিক পরীক্ষা পটভূমিতে দাঁড়িয়ে নয়াদিল্লি-ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্কের বরফ গলাতে এই অভিযান মার্কিন প্রেসিডেন্টের। ভারতকে পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ছেড়ে দিতে রাজি না করা নয় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে উপরে রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিলেন আমেরিকা। তবে অল্প বিস্তর সুসম্পর্ক গঠন হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের।

৪) বিল ক্লিনটন – দীর্ঘ দুই দশক ধরে ভারতে কোন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পা রাখেননি। টাইম যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বজায় থাকে তার জন্য ২০০০ সালে অটল বিহারি বাজপায়ের প্রধানমন্ত্রীত্বকালে ভারত সফরে আসেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। তাই ১৯৯৯ সালে ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধের সময় ক্লিনটনের নেতৃত্বে ভারতের পক্ষে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই প্রসঙ্গে নয়াদিল্লি ভিত্তিক বিদেশনীতি বিশেষজ্ঞ প্রমিত পাল চৌধুরী বলেন,’রাষ্ট্রপতি ক্লিনটনই ভারত-মার্কিন সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই মার্কিন প্রেসিডেন্টের আগে প্রায় ২০ বছর ধরে ভারতের সফর করেনি কোন মার্কিন সরকার। যার ফলে ক্লিনটনের ভারত সফরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের যে বর্তমানেও সুসম্পর্ক রয়েছে তা প্রমাণিত হয়। 

৫) জর্জ ডাব্লু বুশ – প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের যামানায় ২০০৩- ২০০৬ সালের মধ্যে ভারতে এসেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লু বুশ। তবে তখনকার সময় ইরাক আক্রমণের জন্য সারা বিশ্বব্যাপী নিন্দার মুখে পড়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে সকল নিন্দাকে দূরে রেখে ২০০৬ সালের দিল্লিতে আসেন জর্জ ডাব্লু বুশ।  সেই সময় সংসদের বামপন্থী সদস্যরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষণ বয়কট করে। তবে এই দুই দেশের সম্পর্ক জোরদার হয়ে উঠেছিল বাণিজ্য ও পারমাণবিক যুক্তির ক্ষেত্রে।  

মার্কিন প্রেসিডেন্টের তিন দিনের ভারত সফরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরমাণু বিষয়ে এক কঠোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তারা। যা পারমাণবিক সরঞ্জাম সরবরাহকারীদের বাজার থেকে ভারতকে আলাদা করে রাখতে পারেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের এই রাজনৈতিক শলা পরামর্শ প্রসঙ্গে এশিয়ার সিনিয়র সহযোগী মাইকেল কুগেলম্যান বলেন” ময়মন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রিত্ব কালে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে চুক্তি ভিত্তিক স্বাক্ষর হয় সেটি খুব দ্রুত ২০০০ দশকের শুরু থেকেই দুই দেশকেও উন্নতি লাভ করিয়েছে”। 

৬) বারাক ওবামা –  বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনকালের আগে ভারতের শেষ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মনমোহন সিং। মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে ভারত সফরের দুবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট এসেছিলেন। একটি জর্জ ডাব্লুউ বুশ। অপর জন হলেন বারাক ওবামা। ২০১৫-২০১০ সালে দুবার ভারত সফর করেছেন হোয়াইট হাউজের মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। প্রথমে তিনি  ২০০৮ সালে মুম্বাই সন্ত্রাস হামলায় নিহতদের শ্রদ্ধা জানাতে ভারতে এসেছিলেন। পরবর্তীতে আবার ২০১০ সালে দিল্লির বদনের মুম্বাই সফরে এসেছিলেন তিনি। বারাক ওবামার প্রথম সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে ১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন তিনি। পর্যন্ত অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিত্বকালে ২০১৫ সালে ফের ভারতে আসেন  বারাক ওবামা। সেবার কোনরকম চুক্তি স্বাক্ষরের নয় প্রজাতন্ত্র দিবসে প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছিলেন তিনি। এরপরই ভাষণে তিনি জানিয়েছিলেন ভারতে ধর্মীয় বিশ্বাসের দ্বারা বিভক্ত না হলেই ভারতের সফলতা আসবে। 

৭) ডোনাল্ড ট্রাম্প –  ট্রাম্প ভারতে আসার আগে হিউস্টন আয়োজিত হাউডি মোদি অনুষ্ঠানে মার্কিন নিবাসে গিয়ে ভারতীয়দের সামনে বক্তব্য রেখেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। এবার পালা মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাগত জানানো। যার কারণে ২০২০ সালে গ্র্যান্ড ওয়েলকামের মাধ্যমে মার্কিনের সপ্তম হোয়াইট হাউসের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দিয়ে সেই আতিথিয়তা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই তাকে ভারতে ওয়েলকাম করে নরেন্দ্র মোদি। দু’দিনের এই সফরে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রিকেট স্টেডিয়াম মোতেরা স্টেডিয়ামের উদ্বোধন করেন। পাশাপাশি গান্ধী আশ্রম, তাজমহল, রাজঘাট দর্শনে যান ট্রাম্প।‌

তবে রাজনৈতিকবীদদের মতে, চীনের পর ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯৫ সালে ১১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০১৮ সালে ১৪২ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য স্বাক্ষরিত হয় দুই দেশের মধ্যে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফর যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মধ্যে এবং ট্রাম্প-মোদির রসায়নের মধ্যে এক সুদৃঢ় সম্পর্ক গঠন করেছে বলে মনে করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.