বিরাট ভারতের কোহলি

বিশ্বদীপ ব্যানার্জিঃ ২০১২ -র মাঝামাঝি এক সকাল। সূর্য মধ্য গগনের পথে। রোজকার মতো সেদিনও একটু দেরিতেই ঘুমটা ভেঙেছে ‘ফ্ল্যামবয়েন্ট’ আখ্যা পাওয়া বছর তেইশের ছেলেটার। লেট নাইট পার্টির ফল আরকি! সদ্য শেষ হয়েছে ভারত তথা বিশ্বক্রিকেটের সবচাইতে বড় ধামাকা— ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ। কিন্তু রেশ কাটেনি এতটুকুও। সমান তালেই চলেছে তারুণ্যের জোশে উদ্দীপ্ত হয়ে জীবনটাকে পুরোমাত্রায় উপভোগ করা।     সার্থক নামা ছেলে বটে। চিকু। ৯ বছরের গোলগাল চেহারাটা দেখামাত্র আর কোনো নামই মাথাতে আসেনি পশ্চিম দিল্লি ক্রিকেট অ্যাকাডেমির কোচ রাজকুমার শর্মার, নিজ হাতে গড়েপিঠে তোলার সুবাদে যিনি বিলক্ষণ জানতেন, নামের মতোই সুমিষ্ট ফল ভারতীয় ক্রিকেটকে প্রদান করবে তাঁর এই প্রিয় শিষ্য।      হচ্ছিলও তাই। দুর্দান্ত অধিনায়কত্বে অনুর্ধ্ব ১৯ বিশ্বজয়, দেশে-বিদেশে একের পর এক নজরকাড়া শতরান আশা বাড়াচ্ছিল ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে। পাড়ার রক থেকে কলেজের কমনরুম; ট্রেনের কামরা থেকে অফিস ক্যান্টিন, সর্বত্র শুধু একটাই কথা— সচিন তেন্ডুলকরের যোগ্য উত্তরসূরি পেয়ে গিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট। কিন্তু হঠাৎই ছন্দপতন। তাও কিনা আবার আইপিএল নামক গ্ল্যামারের মঞ্চে।

১৬ ম্যাচে ৩৬৪ রান; গড় ২৮— খুব যে একটা খারাপ পারফরম্যান্স, তা নয়। কিন্তু সে তো সাধারণের জন্য। সচিন তেন্ডুলকরের উত্তরসূরিকে মানায় নাকি? তবে কি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের রঙীন দুনিয়ায় চোখ ধাঁধিয়ে গেল? সে যাই হোক, এমনটা চলতে থাকলে সেরা নয়, আর পাঁচজনের একজন হয়েই থেকে যেতে হবে! আলাদা করে আর মনে রাখবে না কেউই। এইজন্যই বুঝি নামকরণ করা হয়েছিল ‘বিরাট’?     বিছানায় বসে উত্তর হাতড়াচ্ছিল ছেলেটা। প্রশ্নগুলো মাথায় তার আগে না আসলেও সেদিন একেবারে ভিড় করে এসেছিল। হবেই তো। দিনটাই যে আর পাঁচটা দিনের মতো নয়, একদম অন্যরকম।     

বছর দুয়েক পরের কথা। সবেমাত্র শেষ হয়েছে অ্যাডিলেড টেস্ট। দুর্দান্ত লড়াই করেও ৪৮ রানে হেরে গিয়েছে ভারত। ব্যবধানটা ১৪৮ এমনকি ২৪৮ ও হতে পারত। কিন্তু সেটা যে হয়নি, তার নেপথ্যে তে কেবল একজনই। প্রথম ইনিংসে শতরানের পর পঞ্চম দিন সাড়ে তিনশোরও কিছু বেশি লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারতীয় ক্রিকেটের লোকগাঁথায় স্থান পাওয়া ১৪১ রানের কাউন্টার অ্যাটাকিং ইনিংস, তাও কিনা প্রথমবার অধিনায়কত্বের বোঝা কাঁধে নিয়ে— ম্যাচ হেরেও বিরাটভাবে জিতে গিয়েছেন কোহলি। অথছ মাসখানেক আগেও তার টেস্টদলে স্থান পাওয়া নিয়েই কম জলঘোলা হয়নি। সমালোচকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। গত ইংল্যান্ড‌ সফরে ১০ ইনিংসে মাত্র ১৩৪ রান। চূড়ান্ত ব্যর্থ বললেও কম বলা হয়। ভরসা করার সত্যিই কি কোনো জো আছে?      কিন্তু কথায় বলে চ্যাম্পিয়নদের ইগো। ৮ ইনিংসে ৪ টি শতরান সহ ৬৯২ রান, গড় ৮৬.৫০—  অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সংঘটিত হওয়া একটি টেস্ট সিরিজে এতটা দাপট আর ঠিক কতজন ভারতীয় দেখাতে পেরেছেন, মনে করতে গেলে মাথা চুলকাতে বাধ্য হবেন অতি বড়ো পরিসংখ্যানবিদ ও।      অবশ্য এ তো হওয়ারই ছিল। ভোরবেলা বাবাকে দাহ করে এসে যে ছেলে ৯০ রানের ইনিংস খেলে দলকে ফলোঅনের হাত থেকে বাঁচায়; শুধুমাত্র কেরিয়ারের স্বার্থে যে ছেলে বিসর্জন দেয় নিজের যাবতীয় শখ-আহ্লাদ, ত্যাগ করে নিজের সবচেয়ে প্রিয় খাবারগুলিকে, সামান্য ব্যাডপ্যাচ আর তার কি করবে? “আমি চ্যালেঞ্জ ভালোবাসি। চ্যালেঞ্জ না থাকলে আসল স্টিভকে আপনারা কোনোদিনই পেতেন না।”

১৯৯৯ বিশ্বকাপের সুপার সিক্স ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানোর পর স্টিভ ওয়র এই অসাধারণ উদ্ধৃতি কখনো না কখনো যে বিরাটের কানে গিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এ থেকেই যে তিনি নিজের ভবিষ্যতের চাঁদমারি তৈরী করে নিয়েছিলেন, তা বোধহয় স্বয়ং কোহলি ও মানবেন না। আসলে, এটাই বাস্তব। স্থান-কাল যাই হোক না কেন, কঠিন পরিস্থিতিতে সকল জিনিয়াসরাই সমান। ভাবখানা এই— ‘আরেবাবা! বিপদের সময়ই যদি রুখে দাঁড়াতে না পারো, তাহলে আর তুমি কিসের চ্যাম্পিয়ন?’ তথ্য বলছে, বিরাটের ৩৮ টি ওয়ানডে শতরানের ২৩ টিই পরে ব্যাট করে, এর মধ্যে ২০ টিতেই জিতেছে ভারত। সাধে কি আর বলেছেন যে তিনি রান তাড়া করতে পছন্দ করেন! একদিনের ক্রিকেটে দ্রুততম দশহাজার রান? হয়ে গেছে। টেস্টে ৫০ এর ওপর গড়? হয়ে গেছে। দুঃস্বপ্নের ইংল্যান্ডে স্বপ্নের পারফরম্যান্স? তাও হয়ে গেছে। কিন্তু টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে শতরান; অধিনায়ক হিসেবে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট সিরিজ কিংবা বড়ো আইসিসি ট্রফি জয়— বাকি রয়ে গিয়েছে অনেককিছুই। আসেনি আইপিএল শিরোপাও। তাছাড়া, বিরাটের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড়ো অভিযোগ হল টানা তিনবছর দায়িত্ব সামলিয়ে দেশকে একনম্বর টেস্টদল করার পরেও অধিনায়ক হিসেবে তিনি এখনো সেরকম পরিণত নন।

৫০ বা ২০ ওভারে তবু মহেন্দ্র সিং ধোনি নামের একটি শীতল মস্তিষ্ক আছে। কিন্তু টেস্টে? সেখানে যে যুক্তির থেকে জোশটাই বেশি কাজ করে, যার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় ডিআরএস নেওয়ার ক্ষেত্রে। প্রার্থনা করবেন যাতে আগামী বছরের জুলাইতে বিশ্বকাপ টা তার হাতেই ওঠে। বছর কয়েক আগে স্বয়ং সচিন একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তার শত শতরানের রেকর্ড যদি কেউ ভাঙতে পারে, তবে সে হয় রোহিত শর্মা না হয় বিরাট কোহলি। তা শর্মাজির থেকে এগিয়ে থাকলেও বিরাট সবে ৬২ (টেস্টে ২৪ এবং একদিনের ম্যাচে ৩৮)। দিল্লি এখনো বহুত দূর। ক্রিকেট ঈশ্বরের কথা আদৌ ফলবে কিনা, সেটা সময়ই বলবে। কিন্তু এটা চোখ বন্ধ করেই বলে ফেলা যায় যে, সচিনের যোগ্য উত্তরসূরি সত্যিই পেয়ে গিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *